সুমনা হোসেনের গল্প কেবল একজন গ্রাফিক ডিজাইনারের পেশাগত যাত্রার গল্প নয়; এটি পরিবার, মাতৃত্ব, দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বপ্নকে একসঙ্গে ধারণ করে এগিয়ে চলার গল্প। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলছেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়। তার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সব দায়িত্বের মাঝেও নিজের জন্য একটু সময় রাখা জরুরি। কারণ একজন নারীর স্বপ্নও তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুই সন্তানের মা হওয়ার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব সামলে তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন নিজের ক্যারিয়ার। বর্তমানে তিনি গ্রাফহাটের পথচলা ও ক্রিয়েটিভ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একদিকে দুই সন্তান, সংসারের নানা দায়িত্ব; অন্যদিকে সৃজনশীল পেশায় নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও নিজের কাজের জন্য সময় বের করে নেওয়া সহজ নয়। তবু ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর নিজের দক্ষতার প্রতি বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সুমনা হোসেন। ছয় বছর ধরে গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত এই নারী মনে করেন, একজন নারীর পরিচয় শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়Ñ নিজের স্বপ্ন, দক্ষতা ও অর্জনও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংসার ও পেশাজীবনের সমন্বয়, মাতৃত্বের ব্যস্ততা এবং নিজের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার গল্প জানাচ্ছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন।
আপনার ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাই।
আমি একজন গৃহিণী, দুই সন্তানের মা এবং পেশায় একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। ছয় বছর ধরে গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত আছি। বর্তমানে আমি গ্রাফহাটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ক্রিয়েটিভ পরিচালক হিসেবে কাজ করছি। পরিবার সামলানোর পাশাপাশি নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একটি পেশাগত পরিচয় তৈরি করতে পেরেছিÑ এটি আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।
সংসার ও পেশাজীবনÑ দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে কীভাবে সামলান?
সত্যি বলতে, সব সময় বিষয়টি সহজ হয় না। আমার বড় সন্তানের বয়স নয় বছর, আর ছোটটির দুই বছর। তাদের দেখাশোনা, রান্না, ঘর গোছানোসহ সংসারের নানা কাজের পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্বও পালন করতে হয়। তাই প্রতিদিনের কাজগুলো পরিকল্পনা করে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কখনো সন্তানদের ঘুমের সময় কাজ করি, কখনো দিনের ব্যস্ততার মাঝখানে সময় বের করি। আবার কাজের চাপ বেশি থাকলে রাত জেগেও কাজ শেষ করতে হয়। সবকিছু সব সময় পরিকল্পনামতো হয় না, তবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
ঘরে বসে রিমোটলি কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
রিমোট কাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ঘরে থেকেই নিজের পেশাগত কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে বাড়িতে কাজ করার অর্থ এই নয় যে কাজের চাপ কম। এখানে সংসার ও অফিসের কাজের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানদের প্রয়োজন, পরিবারের দায়িত্ব এবং ক্লায়েন্টের কাজÑ সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। তাই সময় ব্যবস্থাপনা, মনোযোগ এবং ধৈর্য আমার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুই সন্তানের মা হওয়ার পর নিজের ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সময় বের করা। একজন মা হিসেবে সন্তানদের প্রতি আমার দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে একজন পেশাজীবী হিসেবে কাজের প্রতিও দায়বদ্ধতা আছে। কখনো শারীরিক ক্লান্তি আসে, কখনো মনে হয় নিজের জন্য আলাদা করে সময়ই নেই। তবে আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি, প্রতিটি কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করতে হবেÑ এমন প্রত্যাশা নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়; বরং পরিস্থিতি বুঝে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয় এবং নিজের স্বপ্নের জন্য যতটুকু সম্ভব সময় বের করে নিতে হয়।
গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কোন বিষয়টি আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?
গ্রাফিক ডিজাইনের প্রতি আগ্রহ এবং সৃজনশীলভাবে কিছু তৈরি করার আনন্দই আমাকে এই পেশায় ধরে রেখেছে। আমার কাছে গ্রাফিক ডিজাইন শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি নিজের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা প্রকাশের একটি ক্ষেত্র। একটি কাজের মাধ্যমে যখন নিজের ভাবনাকে দৃশ্যমান রূপ দিতে পারি, তখন আলাদা তৃপ্তি অনুভব করি। এই পেশা আমাকে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে।
সংসারের দায়িত্ব কি কখনো আপনার পেশাগত অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
কিছু পরিস্থিতিতে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে; বিশেষ করে ছোট সন্তানকে সময় দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। তবে আমি সংসারকে আমার ক্যারিয়ারের বাধা হিসেবে দেখি না; বরং সংসার ও সন্তানদের সামলানোর অভিজ্ঞতা আমাকে ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং সময়ের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। জীবনের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমার পেশাগত জীবনেও কাজে লাগে।
নিজের স্বপ্নের জন্য সময় বের করার বিষয়টি আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আমার কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী মা, স্ত্রী কিংবা গৃহিণী হিসেবে পরিবারের জন্য অনেক কিছু করেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের পাশাপাশি তার নিজেরও কিছু স্বপ্ন, আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা থাকে। সেগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের কিছুটা সময় থাকা প্রয়োজন। এই সময়টুকু শুধু কাজ করার জন্য নয়, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্যও জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া মানে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব অবহেলা করা নয়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও রিমোট কাজ নারীদের জন্য কী ধরনের সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করেন?
প্রযুক্তি নারীদের জন্য কাজের নতুন অনেক পথ খুলে দিয়েছে। এখন বিভিন্ন ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করে ঘরে বসেই দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট তৈরি ও অন্যান্য অনলাইনভিত্তিক পেশায় নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন; বিশেষ করে যাদের পারিবারিক দায়িত্ব বেশি, তাদের জন্য রিমোট কাজ একটি কার্যকর সুযোগ হতে পারে। তবে এর জন্য দক্ষতা অর্জন, নিয়মিত অনুশীলন, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি।
গ্রাফহাটের পথচলা ও ক্রিয়েটিভ পরিচালক হিসেবে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমি আমার সৃজনশীল কাজ আরও এগিয়ে নিতে চাই এবং নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চাই। পাশাপাশি গ্রাফহাটের কাজ সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং পেশাগতভাবে আরও বিকশিত হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। আমি মনে করি, শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নতুন কিছু শেখা, কাজের মান উন্নত করা এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই।
ভবিষ্যতে নিজের জন্য কেমন জীবন দেখতে চান?
আমি এমন একটি জীবন চাই, যেখানে পরিবারকে সময় দিতে পারব, সন্তানদের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় পাশে থাকতে পারব, আবার নিজের পেশাগত স্বপ্নগুলোও এগিয়ে নিতে পারব। আমি জানি, সব সময় সবকিছু সমানভাবে সামলানো সম্ভব হবে না। জীবনের একেক পর্যায়ে একেকটি বিষয় বেশি গুরুত্ব পাবে। তবু নিজের পরিচয়, সৃজনশীলতা ও কাজের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে চাই। আমার পথচলা এখনো শেষ হয়নি; সামনে শেখার এবং অর্জনের অনেক কিছু রয়েছে।
আপনার এই পথচলার মূল বার্তা কী?
আমার মনে হয়, একজন নারীর পরিচয় শুধু তার পারিবারিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন মা, একজন গৃহিণী কিংবা একজন স্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি একজন দক্ষ পেশাজীবীও হতে পারেন। সংসার ও ক্যারিয়ার সামলানোর পথ সব সময় মসৃণ হবে না, কিন্তু নিজের স্বপ্নকে একেবারে হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়াও অনেক বড় ব্যাপার। আমি চাই, নারীরা নিজেদের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং নিজের স্বপ্নের জন্য অন্তত কিছুটা সময় বের করে নিন।
