The Sangbad · সাধারণ
জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির একচল্লিশ বছর
১৫/১০/২০২৬

অক্টোবর এলেই জগন্নাথ হলের পরিচিত ভবন, প্রাঙ্গণ ও পথগুলো আমার কাছে অন্য অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। যেখানে একদিন ছাত্রজীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ছিল, সেখানে দেখি হারিয়ে যাওয়া সতীর্থদের মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবসের আয়োজন, স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তিসংবলিত ব্যানার আমাকে তাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তাদের শুধু মৃত্যু নেই; আছে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা সম্পর্কে কিছু অনিষ্পন্ন প্রশ্ন।১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ হলের পুরোনো অ্যাসেম্বলি ভবনের টেলিভিশন কক্ষে শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথিরা বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখছিলেন। দিনভর বৃষ্টির পর রাত নয়টার দিকে ছাদ ধসে পড়ে। প্রাণ হারান ৩৯ জন; আহত হন প্রায় ৩০০ জন। একটি সাধারণ সন্ধ্যা মুহূর্তে অসহনীয় শোকের রাতে পরিণত হয়। সেই ঘটনাকে আমরা অক্টোবর ট্রাজেডি বলে স্মরণ করি। কিন্তু ‘ট্রাজেডি’ শব্দের গভীর বিষণ্নতার মধ্যেও দায়িত্বের প্রশ্ন যেন অস্পষ্ট হয়ে না যায়।প্রাণহানির সংখ্যা ঘটনাটির ভয়াবহতা বোঝায়, কিন্তু ক্ষতির সমগ্র পরিসর বোঝায় না। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের জীবন বদলে যায়। আহতদের চিকিৎসা, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও এই ইতিহাসের অংশ। তাদের পরবর্তী জীবনের নির্দিষ্ট দুর্ভোগ সম্পর্কে তথ্য ছাড়া দাবি করা উচিত নয়। তবে নিহতদের তালিকার পাশাপাশি আহতদের অভিজ্ঞতা ও পরিবারের বক্তব্য সংরক্ষণের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। তাদের কথা ছাড়া এই বিপর্যয়ের মানবিক ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।আমি তখন জগন্নাথ হলের ছাত্র। এই বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষদর্শী। তৎকালীন ছাত্রসংগঠনের কর্মী হিসেবে অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করেছি, দাবি তুলতে উৎসাহ দিয়েছি। সতীর্থের লাশ বহনের যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছিল, তা কোনো বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ স্মৃতি নয়। তার ভার আজও বহন করি। একচল্লিশ বছর পর আমার প্রশ্ন তাই ব্যক্তিগত বেদনা থেকে জন্ম নিলেও তার তাৎপর্য প্রাতিষ্ঠানিক: যে অবহেলার অভিযোগ আমরা তুলেছিলাম, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর কোথায়? আমাদের প্রতিবাদের পেছনে ছিল শিক্ষার্থীর জীবনের প্রতি দায়িত্ব পালনের দাবি। আমরা চাইতাম, কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা করুক কীভাবে বিপজ্জনক অবস্থার একটি ভবন ব্যবহৃত হতে থাকল এবং সতর্কতা বা মেরামতের আবেদন কী পরিণতি পেল। ছাত্রদের সেই প্রতিবাদকে শুধু দুর্ঘটনা-পরবর্তী আবেগ হিসেবে দেখলে তার মূল বক্তব্য হারিয়ে যায়। শোক আমাদের প্রতিবাদের তীব্রতা বাড়িয়েছিল; কিন্তু দাবিটির ভিত্তি ছিল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এই প্রশ্নের সঙ্গে স্মরণের কোনো বিরোধ নেই। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন প্রয়োজনীয়। তাদের নাম, মুখ ও জীবনের পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও কর্তব্য। সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন স্মরণকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সম্পন্ন হওয়ার নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফুল দেওয়া এবং অতীতের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা পৃথক কাজ। প্রথমটি আন্তরিক হলেও দ্বিতীয়টির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।জগন্নাথ হলের সামনে রবীন্দ্রনাথের “মরণসাগরপারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি” পঙ্ক্তিটি দেখলে আমি সেই পার্থক্য নিয়েই ভাবি। আমাদের প্রিয়জনেরা স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন—এই অনুভূতি মানবিক। কিন্তু যাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, তাদের মৃত্যুর পরে ‘অমর’ ঘোষণার ভাষা প্রতিষ্ঠানকে কী দায়িত্ব দেয়? তাদের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে তাদের মৃত্যুর সত্য জানার অধিকারও কি স্বীকার করতে হয় না?একই গানে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—“বন্দীরে দিয়ে গেছ মুক্তির সুধা,তোমাদের স্মরি।সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা,তোমাদের স্মরি।”এখানে স্মরণের সঙ্গে মুক্তি ও সত্যের সম্পর্ক আছে। জগন্নাথ হলের নিহতদের মৃত্যু নিজে থেকে অন্যদের মুক্ত করেছে কিংবা সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। সেই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করতে পারে, অবহেলার বাস্তবতা উন্মোচনের তাগিদ দিতে পারে। কিন্তু তথ্যপ্রকাশ, দায় নির্ণয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ জীবিতদেরই সম্পন্ন করতে হবে। কবিতার প্রতি আস্থা থাকলে তার নৈতিক তাৎপর্য নিয়েও ভাবতে হবে। ‘সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা’ পঙ্ক্তিতে একটি সম্পন্ন কাজের স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ এই মৃত্যুগুলোকে ঘিরে সত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন যদি অনিষ্পন্ন থাকে, তাহলে পঙ্ক্তিটিকে ঘটনার নিষ্পন্ন বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করতে আমার সংশয় হয়। সাহিত্যিক উচ্চারণ আমাদের অনুভূতিকে মর্যাদা দেয়। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই উচ্চারণের সঙ্গে বাস্তব কাজের সম্পর্কও পরীক্ষা করতে হয়। আমার আপত্তি তাই কোনো ব্যানারের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠানের আচরণ সম্পর্কে। স্মরণে ব্যবহৃত ভাষা এবং বাস্তবে পালিত দায়িত্বের মধ্যে কতখানি সংযোগ রয়েছে? ‘তোমাদের স্মরি’ বলার সঙ্গে যদি সংশ্লিষ্ট নথি সহজলভ্য করা, অভিযোগের উত্তর দেওয়া এবং নিরাপত্তার অগ্রগতি জানানো যুক্ত হয়, তাহলে সেই উচ্চারণ আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। অবহেলার প্রশ্নটি কেবল আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে নেই। জগন্নাথ হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. রংগলাল সেন তার ‘জগন্নাথ হলের অক্টোবর দুর্ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধে ভবন সংস্কারের প্রয়োজন এবং বারবার চিঠি দেওয়ার কথা লিখেছেন। তিনি ১৯৭৩-১৯৮৩ সময়ে বিভিন্ন প্রাধ্যক্ষের মেরামতের আবেদন এবং তার পরবর্তী প্রাধ্যক্ষের ১৯৮০ সালের এপ্রিলের চিঠির উল্লেখ করেছেন। তার বিবরণ অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগেই বিপর্যয় ঘটে।অধ্যাপক জগদীশ চন্দ্র শুক্লদাসের স্মৃতিবয়ানেও মেরামতের আবেদন, বিপজ্জনক অবস্থার সতর্কতা এবং মেরামতের সঙ্গে ভবন ব্যবহারের উদ্বেগজনক সম্পর্ক উঠে এসেছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রকাশিত বিবরণে যখন পূর্বসতর্কতার প্রসঙ্গ ফিরে আসে, তখন ঘটনার ব্যাখ্যা শুধু বৃষ্টির ওপর ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট হয় না। আবহাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণে ছিল না; কিন্তু ভবন পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত মানুষের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব স্মৃতিবয়ানকে মূল প্রশাসনিক নথির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করাও যথার্থ হবে না। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সংশ্লিষ্ট চিঠি, প্রকৌশল মতামত, বরাদ্দ, কার্যাদেশ এবং ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত একত্রে পরীক্ষা করলে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বোঝা সহজ হবে। কোন আবেদন কখন পৌঁছেছিল, কী সুপারিশ এসেছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোথায় বিলম্ব হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর চাই। অভিযোগের যথার্থতা প্রতিষ্ঠা কিংবা সংশোধন, উভয়ের জন্যই নথি প্রয়োজন।এই অনুসন্ধানে দায়িত্বের বিভিন্ন স্তরও আলাদা করে দেখতে হবে। হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এক নয়। কেউ সতর্কতা জানিয়ে থাকলে তার স্বীকৃতি প্রয়োজন; কোথাও দায়িত্ব পালিত না হলে সেটিও নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। অস্পষ্টভাবে সবাইকে দায়ী করা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি দায়িত্ব বিভিন্ন দপ্তরে বিভক্ত ছিল বলে প্রতিষ্ঠান সামগ্রিক ব্যাখ্যার কর্তব্য এড়াতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সন্তানকে সেখানে পাঠিয়ে পরিবার শিক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখে। শিক্ষার্থীর পক্ষে ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা বিচার করা কিংবা মেরামতের বরাদ্দ অনুমোদন করা সম্ভব নয়। সে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতার কারণেই প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে বিশেষ দায়িত্ব যুক্ত হয়। প্রাণহানির ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা বাদ দেওয়া চলে না।ঘটনার পরে উদ্ধার, চিকিৎসা ও রক্তদানে যে অসাধারণ মানবিক সংহতি সৃষ্টি হয়েছিল, আমি তা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হকের ‘স্মৃতিচারণ’ লেখায় হাসপাতালের পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সহযোগিতার বিবরণ রয়েছে। বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ইতিহাস আমাদের মূল্যবান সম্পদ। তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কিন্তু উদ্ধারকাজের সাফল্য দিয়ে বিপর্যয়ের আগের সিদ্ধান্তগুলো মূল্যায়ন করা যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠান জরুরি পরিস্থিতিতে আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারে, আবার তার পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতাও থাকতে পারে। একটি দিকের স্বীকৃতি অন্য দিক সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেয় না। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে দুটিই থাকতে হবে।পরবর্তী সময়ে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ড. সৌমিত্র শেখরের ‘অক্টোবর দুর্ঘটনা এবং তারপর’ প্রবন্ধে সহায়তা, ভর্তি-সুবিধা ও ট্রাস্টের বিবরণের পাশাপাশি কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা অন্যায্য। কিন্তু সহায়তা প্রদান এবং অবহেলার দায় ব্যাখ্যা করা পৃথক দায়িত্ব। নতুন ভবন নির্মাণ আবাসনের প্রয়োজন মেটাতে পারে; পুরোনো ভবন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, তার উত্তর দেয় না। পরিবার ও আহতদের প্রতি দায়িত্ব মূল্যায়নেও তাদের নিজেদের বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। কোন সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল, তা কতটা কাজে এসেছিল এবং কোনো প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ ছিল কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করেই তা সংরক্ষণ করা যায়। সহায়তা গ্রহণের কারণে প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্ন তোলার অধিকার সীমিত হয় না।একইভাবে তদন্ত হওয়া, প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া এবং সুপারিশ কার্যকর হওয়াও এক বিষয় নয়। প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. এ. ফায়েজের ২০০৬-২০০৭ সালের শোকদিবসের বাণীতে আগে প্রকাশিত দুটি তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে। তাই তদন্ত বা প্রতিবেদন একেবারেই ছিল না—এমন দাবি যথার্থ নয়। প্রয়োজন হলো প্রতিবেদনগুলোর সিদ্ধান্ত, গৃহীত ব্যবস্থা এবং অবশিষ্ট প্রশ্ন একসঙ্গে জানা। কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল, কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং কোনোটি বাস্তবায়িত না হলে তার কারণ কী—এই বিবরণও প্রকাশ করা দরকার। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দায়িত্ব শেষ হয়েছে ধরে নেওয়া যায় না। সুপারিশের অনুসরণ সম্পর্কে নথি থাকলে তা সামনে আসুক। নথি অনুপস্থিত থাকলে সেই সীমাবদ্ধতাও স্পষ্টভাবে বলা হোক। অনিশ্চয়তা স্বীকার করা ইতিহাসকে দুর্বল করে না; বরং অযাচাইকৃত দাবি থেকে তাকে রক্ষা করে।বর্তমান প্রশাসনকে ১৯৮৫ সালের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ের সঙ্গে এক করে দেখা সমীচীন নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান। নেতৃত্ব বদলালেও নথি সংরক্ষণ, ইতিহাস ব্যাখ্যা এবং শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহাল থাকে। আজকের কর্তৃপক্ষ অতীতের সিদ্ধান্ত নেয়নি; তবু সেই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্যপ্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে। দীর্ঘদিনের সংশয় দূর করার এই সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারে।আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘জগন্নাথ হলের ট্রাজেডি’ প্রবন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাহীনতা ও শিক্ষার প্রতি সামাজিক উপেক্ষার বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছেন। তার বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয়, ভবনের ব্যর্থতার পেছনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ব্যর্থতাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। নতুন নির্মাণ দৃশ্যমান; পুরোনো ভবনের নিয়মিত মেরামত কম আলোচিত। অথচ জীবনরক্ষার জরুরি ব্যয় প্রচারযোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। নিরাপত্তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ভবন নির্মাণের সঙ্গে তার পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কোনো সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ভবনটি ব্যবহৃত হতে থাকলে অন্তর্বর্তী নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠবে। বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেই সময়ে মানুষের জীবন কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।তাই আমার প্রস্তাব, বিশ্ববিদ্যালয় অক্টোবর ট্রাজেডি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ নথিসংগ্রহ প্রকাশ করুক। মেরামতের আবেদন, তদন্ত প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ব্যবস্থার বিবরণ সেখানে থাকুক। পরিবার ও আহতদের সম্মতিতে তাদের সংরক্ষিত নথি যুক্ত করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকুক। কোথায় তথ্যের ঘাটতি আছে, তাও স্পষ্ট বলা হোক। উদ্দেশ্য পূর্বনির্ধারিত রায় ঘোষণা করা নয়; যাচাইযোগ্য ইতিহাসের ভিত্তি তৈরি করা। এই সংগ্রহ শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়, সাধারণ পাঠকের জন্যও ব্যবহারযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। ঘটনার সময়ক্রম, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্ত এবং নথির পরিচয় সহজভাবে উপস্থাপন করা যায়। মূল নথি ও পরবর্তী স্মৃতিচারণ আলাদা রাখা হলে পাঠক বুঝতে পারবেন কোন বক্তব্য প্রত্যক্ষ রেকর্ডে রয়েছে, আর কোনটি ব্যক্তিগত স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্ম তখন শোক দিবসের পেছনের ইতিহাসও জানতে পারবে। অতীতের এই অনুসন্ধানের সঙ্গে বর্তমান নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনাও যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। দাবি শুধু জগন্নাথ হলের জন্য নয়; সব আবাসিক হল এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য প্রযোজ্য। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে নিরাপদ বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভবন খালি করার নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষকে অনিশ্চয়তায় রেখে দেওয়া দায়িত্বের পূর্ণাঙ্গ পালন নয়।শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ জানানোর সুযোগ এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ছাত্র বিপজ্জনক অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ করলে তার বক্তব্য যথাযথ দপ্তরে পৌঁছানো, পরীক্ষা করা এবং সিদ্ধান্ত জানানো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অভিযোগ জানানোর কারণে কাউকে অসুবিধায় পড়তে হলে পূর্বসতর্কতার পথই বাধাগ্রস্ত হবে। ছাত্রদের প্রতিবাদ ও প্রশ্নকে তাই নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।একচল্লিশ বছর পরে আমার অবস্থান প্রতিহিংসার নয়। সতীর্থ-স্বজনদের স্মৃতির প্রতি দায়িত্ব পালনের তাগিদ থেকেই কথা বলি। যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের জীবন কোনো প্রশাসনিক বিবরণের সংখ্যা হয়ে থাকুক, তা চাই না। তাদের স্বপ্ন ছিল, পরিবার ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল। সেই ভবিষ্যৎ কেন থেমে গেল এবং তা রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের কোথায় ব্যর্থতা ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর চাওয়া তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রকাশ। সময়ের ব্যবধান সেই দাবির ন্যায্যতা কমায় না। আমি চাই, বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রকাশিত স্মৃতিবয়ানে থাকা অবহেলার অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক উত্তর দিক। তদন্তের সিদ্ধান্ত, গৃহীত ব্যবস্থা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের বিবরণ প্রকাশ করুক। যেখানে দায়িত্ব পালিত হয়েছে, তার স্বীকৃতি থাকুক; যেখানে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হোক। কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলে সেই সীমাবদ্ধতাও জানানো হোক। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এই সাহস বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকে সমুন্নত করবে। বর্তমান নেতৃত্বের জন্য এটি অতীতের অনিষ্পন্ন প্রশ্ন মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ। সেই আস্থা পুনর্গঠনের কাজ বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায়ও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। ১৫ অক্টোবর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার হিসাব দেওয়ার দিন হয়ে উঠুক। কোন ভবন পরীক্ষা হয়েছে, কোন মেরামত সম্পন্ন হয়েছে, কোন ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে এবং তা দূর করার দায়িত্ব কার—এসব তথ্য প্রকাশিত হোক। শিক্ষার্থীর সতর্কবার্তা যেন নিরুত্তর পড়ে না থাকে। আমাদের প্রজন্মের প্রতিবাদ তখনই স্থায়ী অর্থ পাবে, যখন পরবর্তী প্রজন্মের উদ্বেগ সময়মতো শোনা হবে এবং কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।রবীন্দ্রনাথের “তোমাদের স্মরি” উচ্চারণ তাই আমাদের সান্ত্বনার সঙ্গে বিবেকের দায়ও জাগিয়ে তুলুক। “সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা”—এই পঙ্ক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি বাস্তব পথ হলো মৃত্যুগুলোকে ঘিরে সত্য উন্মোচনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা। নিহতদের মৃত্যু নিজে সেই কাজ করে দেয়নি; দায়িত্বটি আমাদের ওপর রয়ে গেছে। আমরা তাদের স্মৃতিকে যত গভীরভাবে ধারণ করি, তাদের মৃত্যুর কারণ ও দায় সম্পর্কে তত স্পষ্ট উত্তর চাওয়ার কর্তব্যও অনুভব করি। আমার আকাঙ্ক্ষা, জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণে ফিরে আসা শোক একদিন সত্যপ্রকাশ ও দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তাও বহন করুক। নিহতদের পরিবার জানুক, তাদের প্রশ্ন প্রতিষ্ঠান শুনেছে; আহতরা জানুন, তাদের অভিজ্ঞতা এই ইতিহাসে মর্যাদা পেয়েছে; বর্তমান শিক্ষার্থীরা দেখুক, অতীতের শিক্ষা তাদের জীবন রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের ‘অমর’ ঘোষণার আগে ও পরে তাই প্রশ্নটি দৃশ্যমান থাকুক: তাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেন রক্ষা পেল না? সেই প্রশ্নের সৎ উত্তর এবং আজকের জীবন রক্ষায় তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যেই আমাদের স্মরণ পূর্ণতা পেতে পারে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব; জগন্নাথ হলের ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗