“যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, তাদের খবর দাও। আমাদেরকেও মেরে ফেলুক। স্বামীকে ছাড়া দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব, কীভাবে চলব? আমার মেয়েদের এখন কে দেখবে?” স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন শারমিন নাহার রুমা।
স্বামীকে হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। তার বুকফাটা কান্না আর দুই অবুঝ সন্তানের অসহায় মুখ দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরাও। শোকের ছায়া নেমে আসে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী গ্রামের বাড়িতে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনের কাউন্টারের ভেতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক শাকের হোসেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নিহত সাকের হোসেন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়েই চলত স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসার। বড় মেয়ে সামিয়ার বয়স ১১ বছর, আর ছোট মেয়ে মুনতাহার বয়স মাত্র ৬ বছর। বাবাকে হারিয়ে দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
স্বজনরা জানান, প্রতিদিনের মতো বুধবার ভোরেও কর্মস্থলে গিয়েছিলেন শাকের। কাজ শেষে দুপুর ১২টার দিকে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। স্ত্রী ও সন্তানরা হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন তার। তাদের সেই অপেক্ষার আর শেষ হবে না। জীবিত নয়, স্বজনদের কাছে ফিরছে তার নিথর দেহ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টারের সামনে আসেন। ওই সময় কাউন্টারে অবস্থান করা এক নারী যাত্রী পাশের বাথরুমে গেলে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি কাউন্টারের ভেতরে প্রবেশ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই ব্যক্তি শাকের হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান।
স্বামীর এমন আকস্মিক মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী রুমা। কখনো স্বামীর কথা মনে করে হাউমাউ করে কাঁদছেন, আবার কখনো দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ছেন। তার আহাজারিতে বারবার উঠে আসছে একই প্রশ্ন— স্বামীকে ছাড়া কীভাবে চলবে সংসার, কে নেবে দুই মেয়ের দায়িত্ব?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টারের সামনে আসেন। ওই সময় কাউন্টারে অবস্থান করা এক নারী যাত্রী পাশের বাথরুমে গেলে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি কাউন্টারের ভেতরে প্রবেশ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই ব্যক্তি শাকের হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান। পরে বাথরুমে যাওয়া নারী যাত্রী ফিরে কাউন্টারের ভেতরে শাকেরকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখেন। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের কাউন্টারের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক শাকের হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খন্দকার মাইনুল হাসান জানান, ভোরে শাকের হোসেনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা প্রথমে জানান, তিনি স্ট্রোক করেছেন। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তবে সে সময় তার শরীরের কোথাও দৃশ্যমান রক্তপাত পাওয়া যায়নি।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শাকেরের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরে মাথায় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেলে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।
তিনি জানান, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র ধরে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
শাকের হোসেনের মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, এক মুহূর্তে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে একটি পরিবার। স্বামী হারিয়েছেন রুমা, আর বাবা হারিয়েছে সামিয়া ও মুনতাহা। যে মানুষটির হাত ধরে দুই মেয়ের বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই মানুষটির এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
স্বামীর মৃত্যুর শোকের সঙ্গে রুমার সামনে এখন কঠিন বাস্তবতা- দুই মেয়েকে মানুষ করা, তাদের পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া এবং সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা।
