- আপলোড সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০১:০১:১৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০১:০১:১৭ পূর্বাহ্ন
শিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা সনদ অর্জন নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও ফলাফলের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শিশুদের সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও মননশীল বিকাশের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থেকে গেছে। এ বাস্তবতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে সাংস্কৃতিক শিক্ষা চালুর সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, সরকার চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে সাংস্কৃতিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় আবৃত্তি, কেরাত, নাচ, নাটক ও সংগীতসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, সৌন্দর্যবোধ ও পার¯পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ ও সমাজের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংগীত, সাহিত্য, নাটক, নৃত্য কিংবা আবৃত্তি - প্রতিটি মাধ্যমই মানুষের অনুভূতি প্রকাশ, মননশীলতা বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শৈশব থেকেই এসব চর্চার সুযোগ পেলে শিশুরা নিজের প্রতিভা আবিষ্কার করতে পারে। একই সঙ্গে অন্যের মত, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা পায়। সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণতার বিপরীতে একটি উদার ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতেও সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভূমিকা রয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে যেন অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাপ কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্রিক আরেকটি বিষয়ে পরিণত করা না হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হতে হবে আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখা এবং সৃজনশীলতার বিকাশ। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো যাতে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে সংগীত, নাটক, নৃত্য ও চারুকলায় দক্ষ ব্যক্তিদের স¤পৃক্ত করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সাংস্কৃতিক শিক্ষা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের পরিবর্তে এর শিক্ষামূল্য ও বাস্তবায়ন নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান করেই এ শিক্ষা পরিচালিত হতে পারে। বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, পাশাপাশি কোনো শিশুর ওপর অনিচ্ছাকৃত চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। আমরা মনে করি, প্রাথমিক স্তরে সাংস্কৃতিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ শুধু একটি নতুন বিষয় সংযোজন নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক ও সৃজনশীল করে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় বাজেট ও যথাযথ তদারকির মাধ্যমে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির এই সংযোগ শিশুদের মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাবে - এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স

সম্পাদকীয়