মোঃ কবির হোসেন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
ধর্ম যার যার, সম্প্রীতি সবার—এই চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ইউসুফগঞ্জ এলাকা। একই আঙিনায় পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির। একদিকে মসজিদে ধ্বনিত হয় আজান, আদায় হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; অন্যদিকে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের দৃঢ় বন্ধন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৮৩ সালে এই সম্প্রীতির ঐতিহ্যের সূচনা হয়। ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের পাশেই রয়েছে শ্রী শ্রী সাধুবাবা ব্রহ্মচারী আশ্রম। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ এই সময়ে মসজিদ ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো উল্লেখযোগ্য দ্বন্দ্ব বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মুসলমানদের নামাজ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-অর্চনা চলে পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে। একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক আস্থা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক।
মন্দিরের পুরোহিত জানান, মসজিদে নামাজের সময় যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা সব সময় সচেতন থাকেন। পূজা-অর্চনার আয়োজনও এমনভাবে করা হয়, যাতে মসজিদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো অসুবিধা না হয়। মসজিদের মুসল্লি আক্কাস আলী বলেন, “আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি। মুসলমানরা নামাজ পড়ছেন, হিন্দুরা পূজা করছেন। কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি অটুট থাকবে।” মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, “আজান হলে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, আবার পূজার সময় আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানও নির্বিঘ্নে চলে। আমরা উভয়পক্ষ মিলেমিশে নিজেদের ধর্মীয় আচার পালন করি।”
ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াসিন বলেন, “হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে পূজা-অর্চনা করে আসছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাঁদের সব সময় সহযোগিতা করা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়েই এই সম্প্রীতি টিকে আছে।” স্থানীয়দের মতে, ইউসুফগঞ্জের এই চিত্র কেবল পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের গল্প নয়; এটি সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক জীবন্ত উদাহরণ। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান যে সম্ভব, ইউসুফগঞ্জের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য তারই প্রমাণ। বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতাই যে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি, তা এখানকার মানুষের জীবনযাপনেই ফুটে উঠেছে।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার যে সংস্কৃতি ইউসুফগঞ্জে গড়ে উঠেছে, তা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এখানে মসজিদ ও মন্দিরের কার্যক্রম পাশাপাশি চলছে। আসন্ন দুর্গাপূজাও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশাবাদী। এখানকার সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে।”
ইউসুফগঞ্জের এই দীর্ঘদিনের সহাবস্থান প্রমাণ করে, ধর্মীয় ভিন্নতা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতেই হবে—এমন নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা থাকলে একই আঙিনায় ভিন্ন ধর্মের মানুষও শান্তি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করতে পারেন।
The post সোনারগাঁয়ে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, পাশাপাশি নামাজ ও পূজা appeared first on GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ.
