Published on
:
4 min read
এই সময়: রাস্তা সংকীর্ণ ছিল, ভিড় বেশি হয়েছিল, এমনকী মণ্ডপে ঢোকার পথে আলোর সমস্যাও ছিল–– চোর বাগানের পুজোর পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে এমনই তথ্য পেল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিভ টিম(সিট)। বৃহস্পতিবার সিটের অন্যতম প্রতিনিধি, হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী বলেন, ‘আমরা যে সব তথ্য পাচ্ছি তা সবই খতিয়ে দেখা হবে। বেশি লোক ঢুকলে একটা কিছু ঘটবে, সেটা বলাই বাহুল্য।’ বৃহস্পতিবার নদিয়া থেকে চোরবাগান পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনাচক্রে, সেদিন রাতে ঘোষকের ভূমিকায় সেন্টুই ছিলেন। সপ্তমীর রাতে বৃষ্টির মধ্যে দিশেহারা দর্শনার্থীদের কানে ভেসে এসেছিল তাঁরই গলা–– ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে! অবস্থা খুব খারাপ। প্লিজ, মণ্ডপের দিকে আসবেন না।’
চোরবাগানে প্রথম সপ্তমীর রাতে যে ঘটনা ঘটেছিল তার নেপথ্যে উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ের অভাবও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরে যে ভাবে পুলিশ এবং বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ওই পুজো পরিচালিত হতো, এ বছর তাতে ‘ফাটল’ ধরেছিল। অভিযোগ, তড়িঘড়ি নতুন কমিটি গঠনের পরে দর্শকদের নিরাপত্তা এবং ভিড় সামলানোর বিষয়ে যে যে দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল, তা মানা হয়নি। পরিকল্পনাতেও বিস্তর গলদ ছিল। নতুন কমিটির কর্তারা অবশ্য কোনও বিষয়েই মুখ খোলেননি। এ দিনই আবার থ্রিডি স্ক্যানিং করে ঘটনাস্থলের মাপজোক করে কলকাতা পুলিশের ফরেন্সিক দল। সিটের পক্ষ থেকে জানানো হয় চোরবাগানের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও প্যান্ডেল অক্ষত অবস্থায় রাখতে বলা হয়েছে।
ভিড় নিয়ে প্ল্যানের অভাব?
চোরবাগানের ভিড় নতুন বিষয় নয়। সরু গলিতে উপচে পড়া দর্শনার্থীর চাপও থাকে বরাবর। কিন্তু এ বারের পরিস্থিতি যে জায়গায় পৌঁছেছিল, তাতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো। এ দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের সিট। অনুসন্ধানকারী দল দর্শনার্থীদের ঢোকা-বেরোনোর পথ, নিরাপত্তারক্ষীদের প্রস্তুতি এবং পুলিশি নজরদারিতে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে। শুধু পুজোর উদ্যোক্তারা নন, নজরদারির দায়িত্বে থাকা পুলিশ, পুরসভা এবং দমকলের ভূমিকাও সিটের নজরে উঠে এসেছে। সূত্রের খবর, গত কয়েক বছরে পুজোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থাকেও এবার বদলে দেওয়া হয়। চোরবাগানের মতো জায়গায় ভিড়ের চাপ সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল কি না, তাঁদের প্রস্তুতি কতটা ছিল, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
জানা গিয়েছে, ভিড় সামলাতে আগে একসঙ্গে ৭০ জন করে নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকতেন। মূল মণ্ডপে একসঙ্গে ২০০ জন দর্শনার্থী ঢোকার ব্যবস্থা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে ১৫০ জনের বেশি প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে মুক্তারামবাবু স্ট্রিট হয়ে মণ্ডপে ঢোকার পথে অন্তত তিন জায়গায় থাকত ‘ড্রপ গেট’। মণ্ডপে পৌঁছনোর আগেই ভিড়কে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হতো, যাতে একসঙ্গে মানুষের চাপ প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপে সরাসরি এসে না পড়ে। অন্যদিকে, বাইরে বেরোনোর পথের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা ওয়াকিটকিতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন, যাতে ভিড় কমলে দর্শকদের ঢোকানো যায়। এছাড়াও আগের বছরগুলিতে মণ্ডপের ভিতরে থাকা দর্শনার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ বেরিয়ে যাওয়ার পরে নতুন কাউকে ঢুকতে দেওয়া হতো। এ বার প্রথম থেকে সেই নিয়ন্ত্রণ ছিল না বলে সূত্রের খবর। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রবল বৃষ্টিতে মণ্ডপে ঢোকার এবং বেরোনোর ভিড় মিশে গিয়েছিল। তার মধ্যেই মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে’ বলে ঘোষণা হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়ি বাড়তেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায় বলে দাবি তাঁদের। ময়না তদন্তের রিপোর্টে উঠে এসেছে, মৃতদের বেশির ভাগের বুকের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ায় শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হয়েছিল। অনেকের পাঁজরের হাড়ও ভেঙে গিয়েছিল।
নকশায় গলদ? থ্রিডি স্ক্যান
চোরবাগানের মণ্ডপের নকশা এবং প্রবেশ পথের বিষয়ে তথ্য পেতে বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলের থ্রিডি স্ক্যানিং করে ফরেন্সিক বিভাগ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, গোলাকার গ্রিল দিয়ে ঘেরা যে পথে দর্শনার্থীরা যাতায়াত করছিলেন, তার প্রস্থ মাত্র সাত ফুট সাত ইঞ্চি ছিল। চোরবাগানের মতো ভিড়ে ঠাসা পুজোর ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত অপরিসর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যেই গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি সিভিক ভলান্টিয়ার ও ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পুনর্নির্মাণও করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রযুক্তির সাহায্যে মণ্ডপের সঠিক মাপজোক করে প্রবেশ ও বেরোনার পথের ব্যবধান এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কতটা দূরত্ব রাখা হয়েছিল, তা বোঝা সম্ভব। তদন্তকারীদের মতে, অপরিসর পথের কারণে দর্শনার্থীদের যাতায়াতে কতটা বাধা তৈরি হয়েছিল, তাও বুঝতে থ্রিডি স্ক্যানিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই মণ্ডপে মোট ৩০টি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। তার মধ্যে ১৩টি ক্যামেরায় ঘটনার ফুটেজ পাওয়া গিয়েছে। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, বৃষ্টির কারণে বাইরের পথেই ভিড়ে আটকে গিয়েছিল।
মাইকের ঘোষণায় বিপদ?
চোরবাগানে থিমের চমক থাকে প্রতি বছরই। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অপরিসর গলিপথ পেরিয়ে মণ্ডপে ঢোকার জন্য হাজারে হাজারে মানুষ ভিড় করেছিলেন সে দিন। সেই ভিড়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় উদ্যোক্তাদের। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, আচমকা মাইকে ঘোষণা শুরু হয়––‘মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে।’ মনে করা হচ্ছে, একে বৃষ্টি, তার উপরে এমন ঘোষণা বিপদ ডেকে আনে।কে বা কারা ওই ঘোষণা করেছিলেন, ঘটনার পর থেকে সেই অনুসন্ধান শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। সন্দেহভাজন দুই ঘোষককে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন, চোরবাগান পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। বৃহস্পতিবার নদিয়া থেকে আটক করার পর থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিপর্যয়ের পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। আরেকজন ওই এলাকার বাসিন্দা। তিনি আবার পেশায় ট্যাক্সি চালক বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। ক্লাবের এক প্রাক্তন সদস্যের দাবি, এর আগেও চোরবাগানের পুজোয় ভিড় সামলানো নিয়ে সমস্যা হয়েছে। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এ ভাবে আতঙ্ক ছড়ানো হয়নি। তাঁর কথায়, ‘ভিড়ের চাপে মণ্ডপ বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলে মাইকে ঘোষণা করা হতো–– ‘বৈদ্যুতিন সমস্যার কারণে সাময়িক ভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে। ভিড় কমলে ফের মণ্ডপ খুলে দেওয়া হবে।’ কিন্তু, এ বার সরাসরি ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে’ এমন ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুজো উদ্যোক্তা, পুলিশ এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই ঘটনার রাতে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
