১. মেক্সিকোর তুলুমে আয়োজিত ‘ArtWithMe’ উৎসবের জন্য সেখানে স্থাপিত ‘Ven a la Luz’ অর্থ ‘আলোর মধ্যে প্রবেশ করো’। ইস্পাত, কাঠ ও প্রাকৃতিক তন্তুতে নির্মিত বিশাল এই ভাস্কর্যে বুক উন্মুক্ত এক নারীর অবয়বের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও মানুষের গভীর সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। শিল্পকর্মটি এত জনপ্রিয় যে, ছবি তুলতে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি ও যানজট তৈরি হয়। এটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ শিল্পের শক্তিরও অনন্য উদাহরণ। এই শিল্পকর্মটি প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা।

২. লরেঞ্জো কুইনের ভাস্কর্যে বিশাল সাদা হাত একটি তরুণ গাছকে আগলে রেখেছে। কংক্রিটের নগরে এটি যেন হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরার আহ্বান। গাছের অক্সিজেনেই আমাদের জীবন; তাই আধুনিকতার ভিড়ে প্রকৃতিকে ভুলে গেলে চলবে না। হাতের কোনো শব্দ লাগে না। হাতের স্পর্শই সুরক্ষা ও সংযোগের ভাষা। ভাস্কর্যটি যেন বলে, গাছ কাটার বদলে আসুন, একটি গাছ লাগাই, প্রকৃতিকে বাঁচাই, ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখি।

৩. ডগলাস ফার প্রজাতির গাছটি একসময় যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে উঁচু গাছ ছিল, যার উচ্চতা ছিল ৫০ মিটারেরও বেশি। বয়সের ভারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে গাছটি কেটে ফেলা হয়। তবে অবশিষ্ট কাণ্ড দিয়ে শিল্পী ও’রুর্ক তৈরি করেন আকাশমুখী বিশাল হাতের ভাস্কর্য। ৯ বছরের নির্মাণকার্যে তিনি ১২ ধরনের চেইনস ব্যবহার করে এটি নির্মাণ করেন।

৪. ঘানার আবুরি বোটানিক্যাল গার্ডেনের ‘ট্রি অব লাইফ’, এই খোদাই করা বৃক্ষশিল্পটির গোড়া থেকে শুরু করে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত, সম্পূর্ণটাই একে অপরের সঙ্গে মিশে রয়েছে অসংখ্য মানব অবয়ব আকৃতির শিল্পকর্ম। গাছের অসমতল কাঠের পৃষ্ঠের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানুষের হাত, মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ। বাগানটি সরেজমিনে পরিদর্শনকারী এক ব্যক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, শিল্পকর্মটি বাগানের প্রধান লনের কাছে, ভেঙে পড়ে থাকা একটি কাপোক গাছের পাশে অবস্থিত।

৫. ‘আন্ত্রে ভো মাঁ’ (তোমাদের হাতে), ফ্রান্সের আজাক্সিওতে আদ্রিয়েন মার্তিনেত্তির শিল্পকর্ম। একটি বাস্তব গাছের নিচে আঁকা দুটি হাত মাটি ধরে রেখেছে। দেয়ালচিত্রের সঙ্গে গাছের কাণ্ডকে এমনভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেন গাছটি শিল্পকর্মেরই একটি অংশ। ২০২২ সালে আদ্রিয়েন মার্তিনেত্তি এই শিল্পকর্মটি তৈরি করেন। সাঁ-পলের কলেজ ও লিসের শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত ভাবনা ছিল, একসঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করা। যেন বোঝাচ্ছে, আমাদের হাতেই ভবিষ্যৎ পৃথিবী।

৬. নাদিন ও চার্ট্রুজের প্রশান্ত আশ্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান আরবারে ডেভিড জিনের শিল্পকর্ম। আঁকা একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছে নাদিন নামের এক চরিত্র, যার গাছের মুকুট তৈরি হয়েছে বাস্তবের ক্রিপিং জেনি উদ্ভিদের সবুজ পাতায়। শিল্পী ডেভিড জিন এমনভাবে শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন, যাতে আঁকা গাছের শাখা-প্রশাখাগুলো পাশের গাছ লাগানোর বেডের কিনারার সঙ্গে মিশে গেছে। এতে বাস্তব প্রকৃতি ও কল্পনার শিল্পকর্ম এক অপূর্ব রূপে মিলিত হয়েছে। এর মাধ্যমে এটাও বোঝায় যে, ক্লান্ত শরীর গাছের ছায়া খোঁজে।

৭. দ্য (বি)রুইলবোম, নেদারল্যান্ডসের রুরলোতে রেনে ব্রুনসের শিল্পকর্ম। একটি পুরোনো মিষ্টি চেস্টনাট গাছের কাণ্ডের ভেতরে কাচের সামনের অংশযুক্ত ১০টি বই রাখার আলমারি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের নিজ উদ্যোগে নির্মিত এই ব্যতিক্রমী বই বিনিময় গাছটি বাটসডাইক ও ভর্স্টারক্যাম্পভেগ সড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এখানে মানুষ বই রেখে যেতে পারেন, আবার অন্যের রেখে যাওয়া বই সংগ্রহ করেও পড়তে পারেন। এটি প্রকৃতি ও বইপড়ার সংস্কৃতিকে একসূত্রে বেঁধেছে।

৮. ‘ওয়েন্ডি! আমি বাড়ি এসেছি!’, গ্রিসের ইমিতোসে গাছের কাণ্ডে প্রতিকৃতি। দ্য শাইনিং চলচ্চিত্রে জ্যাক নিকলসনের অভিনীত চরিত্রের একটি সাদা-কালো প্রতিকৃতি গাছের কাণ্ডের উন্মুক্ত অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গাছের খসখসে ও অসমতল বাকল প্রতিকৃতিটির মুখমণ্ডলকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে, যা চলচ্চিত্রের ভাঙা দরজার কথা মনে করিয়ে দেয়। এতে বাস্তব গাছের গঠন ও চলচ্চিত্রের বিখ্যাত দৃশ্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অনন্য শৈল্পিক সংযোগ।

৯. ‘হান্ড মিট পার্কবাউম’ (যত্নশীল হাত), সুইজারল্যান্ডের গ্লারুসে ইভা ওয়ের্টলি ও বিট হুবারের শিল্পকর্ম। দেশটির গ্লারুস শহরের ফোকসগার্টেন পার্কে একটি জীবন্ত গাছকে ঘিরে উঠে দাঁড়িয়েছে কংক্রিটের তৈরি পাঁচটি আঙুল। ২০০৪ সালে স্কাল্পচুরা ০৪ প্রদর্শনীর জন্য ইভা ওয়ের্টলি ও বিট হুবার এই শিল্পকর্মটি নির্মাণ করেন। প্রথমে এটি অস্থায়ী স্থাপনা হিসেবে তৈরি করা হলেও, ব্যক্তিগত দাতাদের অর্থায়নে এটি কেনা হয় এবং পরবর্তী সময়ে পার্কেই স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়া হয়। শিল্পকর্মটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের যত্ন ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

১০. হংকংয়ে একটি বটগাছের শিকড় পাথর দিয়ে বাঁধানো পথের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। শিকড়গুলোর বিস্তৃতি এমনভাবে বিন্যস্ত, যেন কেউ পরিকল্পনা করেই নকশাটি তৈরি করেছে। এখানে কোনো রং বা খোদাইয়ের কাজ নেই; পাথরের স্ল্যাবের ফাঁক গলে প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে উঠেছে গাছের শিকড়। এটি প্রকৃতির নিজস্ব সৃজনশীলতা ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

১১. যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের লিটল মিলফোর্ড উডসে ভূমিশিল্পী জন ফোরম্যান গাছের কাণ্ড ও বনের মাটিতে কমলা পাতার ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করেন। পাতা, শ্যাওলা ও মাটিকে ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করে তিনি প্রকৃতিতে ফুটিয়ে তোলেন নান্দনিক নকশা। তার এসব শিল্পকর্ম প্রকৃতির সৌন্দর্যকে এক অনন্য শিল্পরূপে উপস্থাপন করে। যা বার্তা দেয়, কৃত্রিম কোনোকিছু ব্যবহার ছাড়াই, প্রকৃতির ক্ষতি না করেও শিল্পকর্ম সৃষ্টি সম্ভব।

১২. ‘প্রুনিং’ (গাছের ডাল ছাঁটাই), বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে স্মোকের শিল্পকর্ম। বেলজিয়ামের বার্খেমের ‘ফেইক ভিউজ’ প্রকল্পের জন্য তৈরি ‘প্রুনিং’ শিল্পকর্মে শিল্পী স্মোক কর্তৃক আঁকা কাঁচি ও হাতকে একটি বাস্তব গাছের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়েছেন, যেন ছবির চরিত্রটি গাছের ডাল ছাঁটাই করছে। দেয়ালচিত্রটি অ্যান্টওয়ার্পের শিশুদের গ্রন্থাগার ‘দ্য ভার্টেলারিজ’-এ অবস্থিত, যার ঠিকানা তুরকোয়াসস্ট্রাট ১৮। এতে বাস্তব প্রকৃতি ও চিত্রকলার মধ্যে তৈরি হয়েছে এক চমৎকার মেলবন্ধন।

তারেক/
