চারপাশে যত দূর চোখ যায়, শুধুই ফাঁকা মাঠ। কোথাও জনবসতির চিহ্ন নেই, নেই ঘরবাড়ি। অথচ সেই নিস্তব্ধ প্রান্তরের বুকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মন্দির। সেখানে প্রতিদিন নিয়ম মেনে হয় পুজো। কিন্তু সেই জাঁকজমক থাকে না। তবে শরৎ এলেই বদলে যায় ছবিটা! পুরনো স্মৃতি, পারিবারিক টান আর ভক্তিকে সঙ্গী করে দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের লোকপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মানকরের কাহিনি যেন সময়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। কেবল শরতে মা এলে সকলে মিলে যেন জাগিয়ে তোলে হারিয়ে যাওয়া গ্রামকে!
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, প্রায় দু’শো বছর আগে এই এলাকায় ডাকাতের ভয়ংকর দাপট ছিল। আতঙ্কে রীতিমতো রাতের ঘুম উড়ে চলে গিয়েছিল সকলের। এমন অবস্থায় গ্রামের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। নিরাপত্তার খোঁজে ভিটেমাটি ত্যাগ করলেও তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরাধ্য দেবীকে ভুলে যাননি কেউ। এমনকী ধীরে ধীরে গ্রামের জনবসতি সম্পূর্ণ মুছে গেলেও দেবী দুর্গার আরাধনার ধারাটি বিচ্ছিন্ন হয়নি। জনশূন্য প্রান্তরে আজও সেই অতীতের সাক্ষী হয়ে রয়েছে মন্দিরটি। আর পুজোর দিনগুলিতে যে যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই মিলিত হন একসঙ্গে। এই বঙ্গে দূর্গাপুজোর সঙ্গে লোকায়ত সম্পর্কের ভিত কত মজবুত, তা বুঝিয়ে দেয় এই ইতিহাস।
শুরুর দিকে মাটির দেওয়াল ও তালপাতা দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট চালাঘরেই দেবীর পুজো হত। সময়ের সঙ্গে সেই অস্থায়ী উপাসনাস্থলের জায়গা নেয় পাকা মন্দির। এক ভক্তের আর্থিক সহায়তায় তৈরি হয় কংক্রিটের কাঠামো। বদলেছে মন্দিরের চেহারা, হারিয়ে গিয়েছে গ্রামের পরিচিত পরিবেশ, কিন্তু পুজোর রীতি একইভাবে বহমান। বর্তমানে মানকরের পুরনো বাসিন্দারা বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করলেও দেবীর নিত্যপুজো বন্ধ হয়নি। দুর্গাপুজোর সময় পুরনো গ্রামের সঙ্গে আত্মিক যোগ টিকিয়ে রাখতে তাঁরা আবার একত্রিত হন। সাধ্যমতো আয়োজন করে ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে পুজোয় শামিল হন সকলে। তাঁদের কাছে এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখারও মাধ্যম।

পূজারি পরিবারের এক সদস্য অভিজিৎ চক্রবর্তী জানান, মানকর গ্রামটির অস্তিত্ব বর্তমানে আর আগের মতো নেই। তবে গ্রামের মানুষ ছড়িয়ে পড়লেও দেবীর পুজোর ঐতিহ্য তাঁরা ধরে রেখেছেন। বসতি হারানো মানকরের ইতিহাস তাই আজও বেঁচে রয়েছে মন্দিরের নিত্য আরাধনা এবং দুর্গাপুজোর মিলনমেলায়।
