জাতীয় ডেস্ক: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহারের কারণে বর্তমানে শিশুদের সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালিত ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এই হেল্পলাইনে শিশুদের সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত কল আসার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। হেল্পলাইনের পরিসংখ্যান বলছে, আগে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি কল আসত, সম্প্রতি তা বেড়ে প্রতি মাসে গড়ে ৭০টিরও বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হেল্পলাইনে আসা এসব ঘটনার বাইরেও বহু অপ্রকাশিত ঘটনা সমাজে ঘটে চলেছে, যা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিশুদের এই ক্রমবর্ধমান সাইবার ঝুঁকির পেছনে অনেক সময় অভিভাবকেরাও অজান্তে ভূমিকা রাখছেন। পড়াশোনা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে অনেকেই বয়স বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছেন। অথচ ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য এসব প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম না থাকলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর ফলে শিশুরা খুব সহজেই অনলাইনে অপরিচিত ও বিপদজনক ব্যক্তিদের সংস্পর্শে চলে আসছে। অপরাধীরা প্রায়ই শিশুর সমবয়সী পরিচয় দিয়ে বন্ধুত্বের জাল পাতে এবং একপর্যায়ে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেল করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেক শিশুই মানসিক ট্রমা এবং গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়, বরং ডিজিটাল আসক্তি ও অনুপযুক্ত কনটেন্টের কারণেও শিশুরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মোবাইল ফোনে আসক্ত। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথ প্যারেন্টাল গাইডলাইন বা অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ অনুসরণ না করায় শিশুরা কার্টুন বা ভিডিও দেখার সময় প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্টের সামনে পড়ছে। তা ছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার করে শিশুদের সাধারণ পারিবারিক ছবি বা ভিডিও দিয়ে ক্ষতিকর ও নিপীড়নমূলক কনটেন্ট তৈরির প্রবণতাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা তাদের নিরাপত্তা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
শিশুদের এই ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষা দিতে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হয়ে সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম নজরদারিতে রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরভাবে প্যারেন্টাল গাইডলাইন মেনে চলতে হবে এবং শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধ শনাক্ত ও তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করলে শিশুদের এই সাইবার বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
