কালবেলা · স্বাস্থ্য
শিশুর ‘আনডিসেন্ডেড টেস্টিস’ বা গোপন অণ্ডকোষ: লক্ষণ, ঝুঁকি ও চিকিৎসা
১৫/১০/২০২৬

শিশুর জন্মের পর অণ্ডথলিতে একটি বা দুটি অণ্ডকোষের কোনোটি না পাওয়া গেলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ সমস্যাকে Undescended Testis বা Cryptorchidism (ক্রিপ্টোরকিডিজম) বলা হয়। সময়মতো শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভবিষ্যতের অনেক জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস কী?
গর্ভাবস্থায় শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে তৈরি হয়। স্বাভাবিক বিকাশের সময় এটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে অণ্ডথলিতে অবস্থান নেয়। কিন্তু জন্মের সময় একটি বা উভয় অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে না নেমে পেটের ভেতরে, কুঁচকিতে অথবা স্বাভাবিক পথের অন্য কোনো স্থানে থেকে গেলে তাকে আনডিসেন্ডেড টেস্টিস বলা হয়।
কেন এই সমস্যা হয়?
অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বিকাশ ও নিচে নেমে আসার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কারণে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কারণ চিহ্নিত করা যায় না।
যেসব শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি
সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশু (Preterm baby); জন্মের সময় ওজন কম থাকা শিশু এবং গর্ভাবস্থায় অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বিকাশ ও অবতরণে ব্যাঘাত ঘটেছে এমন শিশু।
সময়মতো চিকিৎসা না করালে কী ঝুঁকি হতে পারে?
অণ্ডথলির তুলনায় পেট বা কুঁচকির তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় অণ্ডকোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসা না করালে কয়েকটি জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে:
বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি: বিশেষ করে দুই পাশের অণ্ডকোষ অনুপস্থিত থাকলে ভবিষ্যতে শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
অণ্ডকোষের ক্যান্সার: আনডিসেন্ডেড টেস্টিস থাকলে ভবিষ্যতে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অস্ত্রোপচার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষা করাও সহজ করে; তবে ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয় না।
অণ্ডকোষ পেঁচিয়ে যাওয়া (Testicular Torsion): অণ্ডকোষ পেঁচিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়।
অন্যান্য জটিলতা: কুঁচকিতে হার্নিয়া এবং অণ্ডকোষে আঘাত লাগার ঝুঁকিও থাকতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
অণ্ডথলির এক পাশ বা উভয় পাশ খালি মনে হওয়া; অণ্ডথলির এক পাশ তুলনামূলক ছোট বা কম বিকশিত মনে হওয়া এবং কখনো কখনো কুঁচকির দিকে ছোট গোলাকার অংশ অনুভব করা।
মনে রাখবেন, অণ্ডকোষ স্পর্শ করে না পাওয়া গেলেই যে সেটি পেটের ভেতরে আছে, তা নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করে বিষয়টি নির্ণয় করতে হয়।
কখন চিকিৎসা করানো উচিত?
জন্ম থেকে ৬ মাস বয়স: কিছু শিশুর অণ্ডকোষ এ সময়ের মধ্যে নিজে থেকেই অণ্ডথলিতে নেমে আসে।
৬ মাস বয়সের পর: (সময়সীমা নির্ধারণে পূর্ণ বয়স বা সংশোধিত বয়স বিবেচনা করা হয়) নিজে থেকে নেমে আসার সম্ভাবনা খুব কম।
৬ মাস বয়সে না নামলে: শিশু সার্জন বা শিশু ইউরোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত ৬–১২ মাস বয়সের মধ্যে অস্ত্রোপচার করানো উত্তম; প্রয়োজনে ১৮ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়।
বিশেষ করে জন্মের পর থেকেই শিশুর অণ্ডকোষের অবস্থান পরীক্ষা করা জরুরি। শিশুর বয়স বেশি হয়ে গেলেও চিকিৎসা করানো গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেরি হয়ে গেছে ভেবে চিকিৎসা এড়িয়ে যাবেন না।
চিকিৎসা
প্রধান চিকিৎসা হলো অরকিওপেক্সি (Orchiopexy)। এটি একটি অস্ত্রোপচার, যার মাধ্যমে অণ্ডকোষকে উপযুক্ত স্থানে—অণ্ডথলির ভেতরে—নামিয়ে স্থাপন করা হয়। অণ্ডকোষ কুঁচকিতে থাকলে সাধারণত ছোট কাটার মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা যায়। অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে থাকলে ল্যাপারোস্কপির সাহায্যে অবস্থান নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পর অনেক শিশুই একই দিন বা পরদিন বাড়ি ফিরতে পারে; তবে তা শিশুর অবস্থা ও অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী নির্ভর করে। সাধারণভাবে হরমোন বা ওষুধ দিয়ে এ সমস্যার চিকিৎসা সুপারিশ করা হয় না। অস্ত্রোপচারের উপযুক্ত সময় নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হয়।
মা-বাবার করণীয়
শিশুকে গোসল করানো বা ডায়াপার পরিবর্তনের সময় অণ্ডথলির দুই পাশ খেয়াল করুন।
একটি বা দুটি অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে পাওয়া না গেলে দেরি না করে শিশু সার্জন বা শিশু ইউরোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে ব্যস্ত হবেন না; অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষাই প্রাথমিক মূল্যায়নের মূল ভিত্তি।
শিশুর কুঁচকি বা অণ্ডথলিতে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব বা বমি হলে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
মনে রাখবেন, আনডিসেন্ডেড টেস্টিসের ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা শিশুর ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা এবং সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: এমবিবিএস, এমএস (শিশু সার্জারি)
শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ঢাকা
মূল প্রতিবেদনে যান ↗