চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা টানা ২১ দিনে গড়িয়েছে। নতুন ভিসি অপসারণ ও সাবেক ভিসির পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বাত্মক আন্দোলন ও কর্মবিরতিতে থমকে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব প্রশাসনিক কার্যক্রম। দীর্ঘ দিনেও সংকট সমাধান না হওয়ায় বাড়ছে তীব্র সেশনজটের আশঙ্কা।
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য পদে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত এবং সার্বিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ও শিক্ষার্থীদের মতামত বিবেচনা করা হয়নি, এমন অভিযোগ তুলে চুয়েটে অসন্তোষ দেখা দেয়।
নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি। এরপর থেকে বিক্ষোভ মিছিল, মুখ ও চোখ বেঁধে প্রতিবাদ, প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলানো, অবস্থান কর্মসূচি এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন।
বিশ্ববিদ্যালয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জুলকারনাইন মিহাদ বলেন, ‘এক দফা দাবি যতদিন পর্যন্ত বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন আমাদের শাটডাউন কর্মসূচি চলবে।’
শিক্ষার্থী অর্ণব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই সরকার এ বিষয়টি সমাধান করবে। সরকারের ওপর সেই আস্থা আমাদের আছে। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলমান থাকবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি পালন করবে শিক্ষার্থীরা।’
শিক্ষক সমিতির অবস্থানেও অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অবস্থান নিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, শিক্ষক সমিতির দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় পূর্বঘোষিত পূর্ণ কর্মবিরতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত আরও জোরদার করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। একইসঙ্গে অবস্থান ধর্মঘট আরও জোরদার করার বিষয়েও সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়।
শিক্ষক সমিতির এ সিদ্ধান্তের ফলে চুয়েটের অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শাটডাউনের পাশাপাশি শিক্ষকদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকায় ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সামিউন বাসির বলেন, এ পর্যন্ত বিভিন্ন বর্ষের ১৫টি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ১২ কার্যদিবস ক্লাস নেওয়া যায়নি। বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের সেশনজটের আশঙ্কা রয়েছে। তাই আর কালক্ষেপণ না করে সরকারকে বিষয়টি যৌক্তিকভাবে সমাধানের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সায়েম স্যারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা তার পুনর্বহাল চাই। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি না হয়, সেই বিষয়টিও জোরালোভাবে জানাচ্ছি।
কর্মবিরতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তারাও কর্মবিরতি পালন করছেন এবং উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা আটকে রাখার ঘটনায় নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। নতুন উপাচার্যের নির্দেশে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৮৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন এবং উৎসব ভাতা ছাড় স্থগিত রাখা হয় বলে জানা যায়। পরে ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে বেতন-ভাতা পান শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

চুয়েট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ চক্রবর্তী বলেন, সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।
শিক্ষা ঘণ্টা নষ্ট, বাড়ছে সেশনজটের আশঙ্কা
চুয়েটে টানা ২১ দিনের অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর সেমিস্টার ফাইনাল বা চূড়ান্ত পরীক্ষা সামনে ছিলেন, তাদের পড়াশোনার সূচি এলোমেলো হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, এই পর্যন্ত বিভিন্ন বর্ষের ১৫টি পরীক্ষা হয়নি। এ ছাড়া ১২ কার্যদিবস ক্লাস হয়নি।
প্রকৌশল শিক্ষায় তাত্ত্বিক পাঠের পাশাপাশি ল্যাব ও ব্যবহারিক ক্লাসের গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব কার্যক্রম বন্ধ থাকলে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করাই নয়, ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন ও মূল্যায়নেও প্রভাব পড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা গেলেও সব বিভাগের জন্য তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে ফল প্রকাশ, পরবর্তী সেমিস্টারে উত্তরণ এবং স্নাতক সম্পন্ন করার সময়ও পিছিয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে চাকরির আবেদন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ও অন্যান্য পেশাগত প্রস্তুতিতে। এক বিভাগের পরীক্ষা বা ফল প্রকাশে বিলম্ব হলে পরবর্তী একাডেমিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সেশনজটের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হুমাইরা তাসনিয়া বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
দীর্ঘ সময় পার হলেও সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের জেরে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম টানা বন্ধ থাকলেও কেন দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর মধ্যস্থতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
বিধান বড়ুয়া নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, সায়েম স্যারকে দায়িত্ব দেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনটা কেন করা হয়েছে আমরা জানতে চাই। আমাদের দাবি একটাই, স্যারকে পুনর্বহাল করতে হবে।
তিনি বলেন, ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় অচল। তবুও কেন সরকার নীরব ভূমিকা পালন করছে তা বুঝতে পারছি না। আমরা চাই এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হোক।

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থী অর্ণব বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। সিনিয়র শিক্ষকরা হয়তো যোগাযোগ করছেন। তবে আমরা আশাবাদী, সরকার এ বিষয়ের ওপর নজর দেবে এবং সংকটের সমাধান করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থায় সংকট নিরসনে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আপত্তি ও দাবি পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা, স্থগিত পরীক্ষা আয়োজন এবং সম্ভাব্য সেশনজট এড়াতে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিলেও আন্দোলনের মুখে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে দুই দিনের জন্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পেয়েছেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরাফাত রহমান। ১১ ও ১২ অক্টোবর তার এই দায়িত্ব পালনের কথা। তবে শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে জানতে উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও কোনো জবাব দেননি।
আরএমএন/এমএসএ
