চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর শাখা শিকলবাহা খাল থেকে বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত নারীর হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহত নারীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে একজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সাম্পান নৌকাও জব্দ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌসকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানায় করা মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।
জানা গেছে, নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের নুরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি ‘ম্যাপ সুজ লিমিটেড’ নামের একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার বাইরে সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় নাছির উদ্দিনের ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজুর সঙ্গে বসবাস করতেন।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে জান্নাতুলের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন। তবে তার আগে থেকেই রুবি আক্তার নামে একজন স্ত্রী ছিলেন, যিনি শিকলবাহায় নিজের বাড়িতে বসবাস করতেন। পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, বিয়ের কিছুদিন পর রাজা মিয়ার প্রথম বিয়ের বিষয়টি জানতে পারেন জান্নাতুল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে জান্নাতুলকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেন রাজা মিয়া। এ কাজে তিনি পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন।
তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের কাছেও ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এসব চেষ্টায় সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনায় এগোতে থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজা মিয়া জান্নাতুলকে বেড়ানোর কথা বলে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ের ব্রিজঘাটা এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুজুর আহম্মদ এবং আরও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন।
নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে যায়। নৌকাটি চালান মুসলিম উদ্দিন এবং শুজুর আহম্মদ নৌকা থেকে পানি সেচছিলেন। রাত ৮টার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজা মিয়া জান্নাতুলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর তার মুখ চেপে ধরা হয় এবং রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। জান্নাতুলের মৃত্যু হলে তার হাত-পা বেঁধে লাশ বস্তায় ভরা হয়।
কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের দিকে শিকলবাহা খালে লাশটি ফেলে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাটা এলাকায় ফিরে যান। এরপর তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলেও একপর্যায়ে আত্মগোপনে চলে যান। গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী থানাধীন শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি এক নারীর লাশ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌপুলিশ। লাশটির হাত-পা বাঁধা ছিল।
পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা লাশটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ সময় তার স্বামী রাজা মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করেন পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় নিহতের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে ৩ আগস্ট রাজা মিয়া ওরফে রাজুসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। পিবিআই জানায়, গত ৬ অক্টোবর মামলাটি তাদের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সদরঘাট নৌপুলিশের কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ অক্টোবর অভিযান পরিচালনা করে কক্সবাজারের টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুজুর আহমদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটি তার হেফাজত থেকে উদ্ধার করে জব্দ করা হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মুসলিম উদ্দিনকে গত বুধবার আদালতে হাজির করা হয়। তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততা এবং ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বিআলো/অর্নব