শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও মানসম্মত উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। তবে দেশের শিক্ষা অবকাঠামো গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক সংস্কারের হাওয়া লাগলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য, সরকারি দরপত্রে প্রভাব বিস্তার, নিয়োগে অনিয়ম এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে অগ্রিম বিল পরিশোধের পেছনে সাবেক ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান একাধিক নেতা এবং অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায় ঘিরে তৈরি হয়েছে জোর সমালোচনা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল বিতর্কিত কর্মকর্তারা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে উদ্যোগ দেখা গেলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে তার প্রভাব পড়ে নি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে সুবিধা নেওয়া একশ্রেণির কর্মকর্তা এখনো অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদ দখল করে আছেন। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, লিখিত অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদনের পরও এসব কর্মকর্তার বহাল তবিয়তে থাকা নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার এবং সরোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
তদন্তে অনিয়ম প্রমাণ হলেও পুরস্কৃত মোজাহিদুল আলিফ
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের দালিলিক প্রমাণ পাওয়ার পরও কোনো অদৃশ্য শক্তিবলে প্রশাসনিক শাস্তি এড়িয়ে উল্টো প্রভাবশালী পদে পদায়ন পেয়েছেন তিনি। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংগঠিত হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, কাজ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজই তখনো শেষ হয়নি এবং কেবল চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের প্রক্রিয়া চলছিল। অর্থাৎ, প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারকে অবৈধভাবে অগ্রিম বিল পাইয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হয়নি। কেবল কাফরুলই নয়, সাভার জোনে দায়িত্ব পালনকালে কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতি ছাড়াই একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে আগারগাঁওয়ে প্রধান কার্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে পছন্দের ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতেই তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে এনে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
শীর্ষ পদ বাগাতে তৎপর জাহেদুল করীম
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে লাভজনক পদে বহাল থাকা এবং বর্তমানে শীর্ষ পদ হস্তগত করার দৌড়ে এগিয়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে জাহেদুল করীমের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ঘোষিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বছরের পর বছর সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী এই কর্মকর্তা পটপরিবর্তনের পরও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসীন হতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে এবং নানা কৌশলে শীর্ষ পদে বসার এই চেষ্টা অধিদপ্তরের সৎ ও বঞ্চিত প্রকৌশলীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ে প্রশ্ন ও জবাবদিহির অভাব
অধিদপ্তরের চলমান এসব অনিয়ম, বদলি-বাণিজ্য এবং অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের তির এখন খোদ প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর দিকেও। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ অভিভাবক হওয়া সত্ত্বেও অধীনস্থ বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না করা, আর্থিক অনিয়মে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করা এবং দরপত্র মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। শিক্ষা অবকাঠামোর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর ভূমিকা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো একটি সরকারি সংস্থায় যদি দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হয়, তবে শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ দুর্নীতি ও অনিয়মের গ্রাসে তলিয়ে যাবে। ভুক্তভোগী ও সাধারণ কর্মকর্তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অতীতে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম, অনৈতিক বদলি-বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
