চট্টগ্রাম বিভাগে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ধান, চাল ও গম সংরক্ষণের বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং আমদানি বাড়ায় মজুদের এই অবস্থান তৈরি হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড বলে জানিয়েছেন খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের ৩টি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ গুদাম (সিএসডি), ১০৬টি স্থানীয় সংরক্ষণ গুদামে (এলএসডি) এবং ৪টি সাইলো’র (আধুনিক সংরক্ষণ গুদাম) বিদ্যমান ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। এসব গুদামে (গত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত) মজুদ আছে ৫ লাখ ১২ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। অর্থাৎ ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ৩৩ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন বেশি খাদ্যশস্য মজুদ আছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, ‘দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে বর্তমান সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের যে কোনো ধরনের অভিঘাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উৎস থেকে পর্যাপ্ত আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলছে। সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টার কারণে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের গুদামগুলো এখন খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড গড়েছে।’
গত সপ্তাহে সরকারের খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম চট্টগ্রামের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও মজুদ সরেজমিনে দেখতে আসেন। তিনি পতেঙ্গায় নির্মাণাধীন আধুনিক সাইলো, দেওয়ানহাট ও হালিশহরের সিএসডিতে গিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন।
খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য এনে চট্টগ্রামে মজুদ করা হয়। চট্টগ্রাম নগরী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমতল ভূমির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে এ অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহের বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ধান ও চাল সংগ্রহের পাশাপাশি আমদানিকৃত চালের প্রায় ৬০ শতাংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমে খালাস হয়। ফলে খাদ্যশস্য গ্রহণ, সংরক্ষণ ও বিতরণে এ বিভাগের গুদামগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদিকে পতেঙ্গায় ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে এই অঞ্চলে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় মজুদ ছিল প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯২ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। জেলার হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি এবং ১৫টি এলএসডিতে উল্লেখিত পরিমাণ চাল, ধান ও গম সংরক্ষিত ছিল। সে সময় হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডির সম্মিলিত কার্যকর ধারণক্ষমতা ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টন। তার বিপরীতে সেখানে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৭৪১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এ দুই গুদামে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৭১ হাজার ৮৯ মেট্রিক টন বেশি খাদ্যশস্য বেশি মজুদ আছে। একই সময়ে জেলার ১৫টি এলএসডিতে মজুদ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী জানান, খাদ্যশস্যের মজুদ এবং বিলি-বণ্টন চলমান প্রক্রিয়া। ধান ও চাল সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও আমদানির সমন্বয়ে এখন মজুদ উদ্বৃত্ত থাকছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাসসকে বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় দেশের কৃষি উৎপাদনের সব সূচকই এখন ভালো। উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ বাড়ায় উৎপাদন প্রতি বছর বাড়ছে। এখন দেশে রবি-আউশ-আমন তিনটি মৌসুমেই বাম্পার ফলন হচ্ছে। সে কারণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা দেশের জন্য বড় অর্জন।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি খাদ্যশস্য মজুদ থাকা একটি স্বস্তিদায়ক খবর। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা-ই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কাজ, সেটি বর্তমান সরকার ধরে রাখতে পারলে সবার জন্যই কল্যাণকর। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যসহায়তা এবং দুর্যোগকালে জরুরি খাদ্য সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে মজুদের এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু গুদামে খাদ্যশস্য জমা রাখাই যথেষ্ট নয়; সঠিকভাবে সংরক্ষণ, নিয়মিত গুণগত মান পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।’
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: চট্টগ্রাম
১৪ অক্টোবর ২০২৬
০৫ অক্টোবর ২০২৬
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
