গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) উন্নয়নে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে ৩৬ কিলোমিটার সড়ক, ৩৪টি সংযোগ সড়ক ও ১৭টি খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের যানজট, ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে থাকা গাজীপুর মহানগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরীর সড়ক যোগাযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত, খাল পুনঃখনন ও পরিবেশ উন্নয়নে ২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর মহানগরের যোগাযোগব্যবস্থা ও নাগরিক সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আটটি জোনে সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় মহানগরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ সহজ করা, যানজট কমানো, পণ্য পরিবহন গতিশীল করা এবং পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট-সেরালীবাড়ি ব্রিজ পর্যন্ত নির্মিত সড়ক থেকে ফুলচান মার্কেট, ভাওয়াল রেলস্টেশন, ধীরাশ্রম রেলস্টেশন ও বনমালা সড়ক হয়ে টঙ্গী উড়ালসেতুর নিচ দিয়ে তুরাগ নদের পাড় পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মহানগরের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আরও ৩৪টি ছোট-বড় সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে।
সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কের পাশে প্রায় ৮০ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হবে। এতে একদিকে যেমন সড়ক যোগাযোগ উন্নত হবে, অন্যদিকে নগরীর সবুজায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নে খাল পুনঃখনন এবং খালপাড়ের উন্নয়নকেও প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ১৭টি খাল খনন ও পুনঃখননের পাশাপাশি খালপাড়ে ব্লক বসিয়ে সবুজ এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রবীণ নাগরিকদের অবসর ও বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে অসংখ্য শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে চলাচল করতে হয়। শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়ক যোগাযোগের ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। ফলে পরিকল্পিতভাবে সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ করা গেলে নাগরিক ভোগান্তি কমার পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের ফোকাল পারসন প্রকৌশলী আশরাফ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাজীপুরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে গতি আসবে। একই সঙ্গে খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ ও সবুজ এলাকা সৃষ্টির মাধ্যমে গাজীপুরকে আরও বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব মহানগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প গাজীপুরের নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্পের সুফল পেতে হলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করছেন নগরবাসি। বিশেষ করে খাল দখলমুক্ত রাখা, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং রোপণ করা গাছের পরিচর্যার বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন করছেন স্থানীয়রা। প্রকল্পটি যেন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং পরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগ, জলাবদ্ধতামুক্ত পরিবেশ, সবুজায়ন ও উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিতের মাধ্যমে গাজীপুরকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব মহানগর হিসেবে গড়ে তোলে সেই প্রত্যাশাই করছে নগরবাসী।
