দফায় দফায় চুরির ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কোথাও মাটি খুঁড়ে ভূগর্ভস্থ কেব্ল তুলে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও কেটে নেওয়া হচ্ছে রানওয়ের বাতির বৈদ্যুতিক তার।
এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৫টি ট্রান্সফরমারসহ কয়েক লাখ টাকার ক্যাবল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে নিরাপত্তা সংস্কৃতির উন্নয়ন ও নিরাপত্তাবিষয়ক জনসচেতনতা বাড়াতে তিন দিনব্যাপী ‘বিমানবন্দর নিরাপত্তা সপ্তাহ-২০২৬’ চলছে শাহ আমানতে। এর মধ্যেই সর্বশেষ বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে চুরির ঘটনায় মালামালসহ চোর চক্রের এক সদস্যকে আটক করেছেন বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা।
বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাতে, বৃষ্টি কিংবা কুয়াশার মধ্যে উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বারবার চুরির ঘটনায় স্পর্শকাতর এই স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিমানবন্দরের বৈদ্যুতিক কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যারোনেসের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আনিসুর রহমান জানান, রানওয়ে এলাকায় বারবার চুরির ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন নুর হোসেন বলেন, রানওয়েতে চুরি হয়নি; রানওয়ের পাশে বোট ক্লাবের কাছে দুটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টির সময় ঘাস বড় হয়ে যাওয়ায় সেখানে চুরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরে ঘাস পরিষ্কার করে দুটি আনসার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চুরির এ ঘটনার শুরু গত আগস্ট মাসে। আগস্টের শেষ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত আটটি পৃথক তারিখে চুরির ঘটনায় ২৫টি ট্রান্সফরমারসহ কয়েক লাখ টাকার কেব্ল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম খোয়া গেছে। চুরি হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে রানওয়ের ভূগর্ভস্থ কেব্ল, অ্যাপ্রোচ লাইটের কেব্ল, নিরাপত্তাবাতির সংযোগ এবং রানওয়ের আলোকব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জাম।
গত ২১ আগস্ট রাতে রানওয়ের ০৫ প্রান্ত থেকে একটি ট্রান্সফরমারসহ প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কিট কেব্ল চুরি হয়। একই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় রানওয়ের ভূগর্ভস্থ কেব্ল, লাইট এবং লাইটের ফেজ ও লুপিংয়ের সরঞ্জাম।
২ সেপ্টেম্বর রাতে কার্গো ওয়্যারহাউসের পশ্চিম সীমানা থেকে রানওয়ের ০৫ প্রান্ত পর্যন্ত নিরাপত্তাবাতির প্রায় আধা কিলোমিটার কেব্ল কেটে নেওয়া হয়। এতে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা অন্ধকার হয়ে পড়ে। ওই দিন ভিওআর (ভিএইচএফ ওমনি-ডিরেকশনাল রেঞ্জ) এলাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও চুরি হয়।
এরপর ৮ সেপ্টেম্বর রানওয়ের ২৩ এলাকায় দুটি ট্রান্সফরমারসহ অ্যাপ্রোচ লাইটের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কিট কেব্ল চুরি হয়। ১০ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে তিনটি ট্রান্সফরমারসহ কেব্ল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ১৩ সেপ্টেম্বর বোট ক্লাবের কাছে ২৩ প্রান্ত থেকে ছয়টি ট্রান্সফরমারসহ অ্যাপ্রোচ লাইটের বিভিন্ন কেব্ল চুরি হয়।
২৮ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে পাঁচটি এবং ৬ অক্টোবর আরও পাঁচটি ট্রান্সফরমারসহ কেব্ল চুরি হয়। সর্বশেষ ১০ অক্টোবর রাতে ২৩ এলাকা থেকে তিনটি ট্রান্সফরমারসহ কেব্ল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘটনায় মোট ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, রানওয়ের কাছাকাছি এলাকায় মাটি খুঁড়ে প্রায় চার ফুট গভীর থেকে কেব্ল তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রানওয়ের বাইরের ওভারহেড কেব্লও চুরি হচ্ছে। একের পর এক এসব ঘটনায় বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি একটি এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন বলেন, রানওয়ের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত আলো ছাড়া উড়োজাহাজ অবতরণে সমস্যা হতে পারে। বৃষ্টি ও কুয়াশার সময়ও পর্যাপ্ত আলো গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
জানা গেছে, বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী ১৫০, আনসার ২০০, এপিবিএন ১০৫ এবং বিমানবাহিনীর ১৮০ সদস্যসহ মোট ৬৩৫ জন দায়িত্ব পালন করছেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক সদস্য দায়িত্ব পালন করলেও কীভাবে বারবার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আরও ৬০ জন আনসার দেওয়া হবে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তিনি শুক্রবার নিজে বিমানবন্দর পরিদর্শনে যাবেন বলেও জানান।