সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রবাসী কর্মীসহ সৌদিগামী যাত্রীরা। ঢাকা থেকে বুধবার পর্যন্ত মোট ৮৯টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন ১৪ হাজার ৬৫৫ জন যাত্রী। পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন যেসব প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে। নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তাদের কর্মসংস্থান ও বিদেশযাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা দিয়েছে। সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো রিয়াদ ও দাম্মামের পরিবর্তে মদিনা ও জেদ্দা বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিকল্প ফ্লাইটে আসনসংকট থাকায় টিকিট পরিবর্তন করে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন না সবাই একই সময়ে। ফলে যাত্রীদের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ভোগান্তি বাড়ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গতকাল বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল বা স্থগিত হওয়া ৮৯টি ফ্লাইটের মধ্যে ৩৯টি সরাসরি এবং ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি এবং সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের পাঁচটি রয়েছে। অন্যদিকে ভারতসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি দিয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী এয়ারলাইন্সগুলোর ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইটও বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ছয়টি, সালাম এয়ারের চারটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে।
রিয়াদ ও দাম্মামে পরিস্থিতি বেশি জটিল: ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মাম, মদিনা ও জেদ্দা বিমানবন্দরে সরাসরি এবং ট্রানজিটের মাধ্যমে যাতায়াত করেন যাত্রীরা। হামলার পর এসব গন্তব্যের মধ্যে রিয়াদ ও দাম্মামে ফ্লাইট চলাচল সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় সেখানে ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সেখানে অনেক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
অন্যদিকে মদিনার প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানা গেছে। জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও সপ্তাহের শুরুতে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটলেও পরে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ আবার চালু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রিয়াদ ও দাম্মামগামী যাত্রীদের মদিনা ও জেদ্দা দিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এয়ারলাইন্সগুলো। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, টিকিট পরিবর্তন করে বিকল্প গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে যাত্রীদের। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে বিকল্প ফ্লাইটে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে।
ভিসার মেয়াদ নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা: ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবগামী প্রবাসীরা। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তাদের ভিসা, চাকরিতে যোগদান এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা জানান, যেসব যাত্রীর ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে, বিনামূল্যে টিকিট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিকল্প ফ্লাইটে আসনসংকট থাকায় সব যাত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, বিমানের কোনো ফ্লাইটে আসন খালি না রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি বুকিং হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও কিছু যাত্রীকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা ঘটেছে। তবে পরবর্তী ফ্লাইটে তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এয়ারলাইন্স-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিকল্প ফ্লাইটে টিকিট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আসন প্রাপ্যতাই প্রধান সীমাবদ্ধতা। সংশ্লিষ্ট রুটগুলোতে আগে থেকেই যাত্রীদের বুকিং থাকায় নতুন করে বিপাকে পড়া যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত আসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ: ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় যাত্রীদের দুর্ভোগ শুধু যাত্রা বিলম্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীদের জন্য সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিসার মেয়াদ, চাকরিতে যোগদানের নির্ধারিত সময় এবং বিদেশযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা তাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলছে। এ অবস্থায় যাত্রীদের দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর পাশাপাশি টিকিট পরিবর্তনের নিয়ম, সম্ভাব্য যাত্রার তারিখ এবং ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া জরুরি।
যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে টিকিট পরিবর্তন, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের তালিকা এবং বিকল্প ফ্লাইটে আসন বরাদ্দের বিষয়ে এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। যাত্রীরা যাতে বিমানবন্দরে গিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য যাত্রার আগে তাদের নিশ্চিত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর পরিস্থিতি এবং ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনশীল হওয়ায় যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ফলে হামলার পর সৌদিগামী ফ্লাইট চলাচলে সৃষ্ট অচলাবস্থায় সাড়ে ১৪ হাজারের বেশি যাত্রীর দুর্ভোগ এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিকল্প বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আসন সংকট ও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার চাপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। দ্রুত ও কার্যকর সমন্বয়ই এখন যাত্রীদের অনিশ্চয়তা কমানোর প্রধান উপায়।
বিআলো/অর্নব