বাংলাদেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে। তবে, এই প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস নতুন বিদেশি মূলধন নয়; বরং আগে থেকে দেশে ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৩৪৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বেড়েছে ৫৫ শতাংশের বেশি, বিপরীতে নতুন ইকুইটি মূলধন কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় বেড়ে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৬৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ।
বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করে যে মুনাফা অর্জন করে, তার একটি অংশ দেশে আবার বিনিয়োগ করলে তা পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় হিসেবে গণ্য হয়। এ খাতে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে আগে থেকে কার্যক্রম চালানো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশেই থাকছে এবং পুনরায় বিনিয়োগ হচ্ছে। তবে, এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী বা নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে কি না, তা বোঝা যায় না।
নিট এফডিআইয়ের অন্য দুই উপাদানে চিত্রটি ভিন্ন। নতুন ইকুইটি মূলধন বা সরাসরি নতুন বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ খাতে নিট প্রবাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে আন্তঃকোম্পানি ঋণ হিসেবে মোট ৩৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার এলেও আগের ঋণের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধ করায় নিট প্রবাহ কমে যায়। অর্থাৎ মোট অর্থপ্রবাহ এবং নিট অর্থপ্রবাহের মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল।
নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য চাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব রক্ষণশীল থাকায় নতুন মূলধন আকর্ষণ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ কমেছে
এফডিআই’র খাতভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক চিত্রেও পার্থক্য রয়েছে। এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরের খাতে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই কমে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে আগের প্রান্তিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই ছিল ০ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল–জুনে এ খাতে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে, নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো চ্যালেঞ্জের বিষয়।
তিনি বলেন, আগে থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এটি দেশে তাদের ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি আস্থার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এর ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নাহিয়ান রহমান রচি আরও বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। সংস্থাটির ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে কাজ চলছে।
চীনা শিল্পাঞ্চল ঘিরে ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। নাহিয়ান রহমান রচি বলেছেন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্পটি এক দশকের বেশি সময় ধরে আটকে ছিল। এখন এর উন্নয়নকাজ এগোচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই অঞ্চলকে ঘিরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন কারখানা ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশের সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর প্রস্তুতি ও উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত সম্পন্ন কাজ এবং যেসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হয়েছে। সামনে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য জানানো হবে বলে জানান তিনি।
