একই আঙিনায় মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ ও মন্দির। এক পাশে মসজিদে আজান ও নামাজ, অন্য পাশে মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন। আজানের সময় বন্ধ থাকে ঢাকঢোলের বাজনা, নামাজ শেষে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়ি।
প্রতিবছরের মতো এবারও চৌধুরী বাড়ির মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। অন্যদিকে, মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহনশীলতায় শান্তিপূর্ণভাবে চলছে ধর্মীয় আয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উঝা ঠাকুর কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির। পরে ১৯৬৯ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় চৌধুরী বাড়ি ক্লাব। ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। এর কয়েক বছর পর, ১৯৭২ সালে একই আঙিনায় নির্মাণ করা হয় নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। এরপর থেকেই একই স্থানে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের ধর্মীয় কার্যক্রম।
দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ পূজা-অর্চনা, উলুধ্বনি ও ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে। তবে মসজিদে আজান ও নামাজের সময় বিবেচনায় রেখে বন্ধ রাখা হয় ঢাকঢোল, মাইক ও সাউন্ড বক্সের বাজনা। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই পারস্পরিক সমঝোতায় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পূজারিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এই মন্দিরে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছেন। পাশে মসজিদ থাকলেও পূজা আয়োজনে তাঁদের কোনো সমস্যা হয় না। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে, আজান ও নামাজের সময় তাঁরা পূজার কার্যক্রম ও বাদ্যযন্ত্রের বাজনা বন্ধ রাখেন।
তাঁদের ভাষ্য, এখানে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
মসজিদের ইমাম বলেন, মসজিদের পাশেই ঈদগাহ মাঠ এবং এর পাশেই মন্দির। প্রতিবছর এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার সময় প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। তবে নামাজের সময় পূজার আয়োজকেরা তাঁদের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। মসজিদ কর্তৃপক্ষও পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করে। এখন পর্যন্ত সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
চৌধুরী বাড়ি ক্লাবের সভাপতি লিটন পোদ্দার বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। মসজিদে নামাজের সময়সূচি বিবেচনায় রেখেই পূজার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মসজিদ কমিটিও পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করে।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিচয় বহন করে। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল লাভলু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে একে অপরকে সহযোগিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। শুধু পূজা উদযাপন নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন। এই সম্প্রীতি ও বন্ধন ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ধর্মীয় আচার পালনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে চৌধুরী বাড়িতে বছরের পর বছর ধরে বজায় রয়েছে সম্প্রীতির এই পরিবেশ। একই আঙিনায় মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ ও মন্দিরের সহাবস্থান স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।
The post ৫৬ বছর ধরে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির appeared first on ভোরের চেতনা.
