বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে অবস্থিত মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ এখন কেবল পর্যটনের আকর্ষণ নয়, বরং দেশের শুটকি শিল্পের এক বিশাল হাবে পরিণত হয়েছে। সাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিষমুক্ত উপায়ে রোদে শুকিয়ে এখানে তৈরি হচ্ছে উন্নত মানের শুটকি, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। চলতি মাস থেকেই সোনাদিয়াসহ দ্বীপের অন্তত ছোট বড় ২০টি স্থানে শুরু হচ্ছে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের তোড়জোড়।
সোনাদিয়ার মগ চরের বাসিন্দা শুটকি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সোনাদিয়া ও মহেশখালীর উপকূলীয় অঞ্চল ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, শাপলাপুর ও ছোট মহেশখালীর মুদিরছড়ার জালিয়াপাড়া এলাকায় চলে শুটকি উৎপাদনের মহোৎসব। জেলেরা রূপচাঁদা, লাক্ষা, লইট্টা, ফাইস্যা, ছুরি, চিংড়ি ও পোয়া মাছসহ নানা প্রজাতির মাছ সাগর থেকে সংগ্রহ করে তীরে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে সোনাদিয়া দ্বীপের বালুচরগুলোতে সারিবদ্ধ মাচায় মাছ শুকানোর দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক কর্মযজ্ঞ। অর্গানিক শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রসঙ্গে মহেশখালী পৌরসভার গোরকঘাটার বাসিন্দা উদ্যোক্তা আবু শাহেদ মিশাল বলেন, সচরাচর পচন রোধে শুটকিতে কীটনাশক ও ওজন বাড়াতে লবণ ও ডিডিটি পাউডার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বিশুদ্ধ শুটকিতে এসব করা হয় না। শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে আমরাই কেবল সূর্যের তাপের মাধ্যমে শুটকি উৎপাদন করি। এ সময় শুটকির মাচাগুলো মশারি ও প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা থাকায় মশা–মাছি বসতে পারে না। অর্গানিক উপায়ে উৎপাদন করা হচ্ছে শুটকি, শুকানোর পর শুটকি উন্নত প্রযুক্তির ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত করা হয়। প্যাকেটের সময় ভেতরে অঙিজেন থাকলে পোকা বা জীবাণু জন্ম নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের শুটকিতে সেই ঝুঁকি নেই। এ ছাড়া এতে করে শুটকি দীর্ঘদিন সতেজও থাকে।
মহেশখালীর গোরঘাটা ছোট রাখাইন পাড়ার শুটকি ব্যবসায়ী অংক্যা মং বলেন, বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি রূপচাঁদা শুটকি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা, মাইট্যা ১৭০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকা, কোরাল ১৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, পোপা ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিংড়ি ২৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, লইট্যা ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা, ছুরি ১৬০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, অন্যান্য মাছ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়ে থাকে। মহেশখালীতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের প্রধান পছন্দ হচ্ছে সোনাদিয়ার শুটকি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের আঞ্চলিক প্রতিনিধি জাফর আলম বলেন, শুটকি সংরক্ষণে ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান চিত্র বদলেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এখন ‘ড্রায়ার পদ্ধতি’ এবং ‘গ্রিন হাউস’ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বৃষ্টির দিনেও মাছ শুকানোর জন্য আধুনিক ড্রায়ার ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। ওয়ার্ল্ড ভিশনের আর্থিক সহায়তায় মহেশখালীর গোরকঘাটা বাজারের পূর্বপাশে জেটি সংলগ্ন স্থানে একটি আধুনিক পদ্ধতিতে শুটকি সংরক্ষণের জন্য ড্রায়ার পদ্ধতির সংরক্ষণাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এই হিমাগার কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র শুটকি ব্যবসায়ী ও জেলেদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক জেলেরা এই হিমাগারের সুবিধা ভোগ করে এখন শুটকি উৎপাদন ও সংরক্ষণ করছে।
মহেশখালী পৌরসভার পুটিবিলার বাসিন্দা ফিশিং ট্রলার মালিক ও শুটকি উৎপাদনকারী ব্যবসায়ী সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেন, বর্তমানে সূর্যের তাপ ব্যবহার করে মাছি ও ধুলোবালিমুক্ত পরিবেশে শুটকি তৈরি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বেশ কিছু এনজিও সংস্থা আধুনিক পদ্ধতিতে শুটকি করার জন্য সোলার প্যানেল স্থাপন করে ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে স্বল্প লবণের শুটকি উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। শুটকির আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত ব্যবহার, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে বলে আমি মনে করি।
মহেশখালীর ই–কমার্সের প্রশিক্ষক সংবাদকর্মী আ ন ম হাসান বলেন, দেশের প্রথম ডিজিটাল আইল্যান্ড মহেশখালী থেকে ই–কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এই পণ্য। চট্টগ্রামের আছদগঞ্জ হয়ে এই শুটকি ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সমবায় ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের শুটকির বড় একটি অংশ এখন মধ্যপ্রাচ্য, হংকং, চীন ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হচ্ছে। সোনাদিয়ার অর্গানিক শুটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করা গেলে এই খাত থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
কঙবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মহেশখালীর বাসিন্দা শুটকি আমদানি ও রপ্তানিকারক আব্দুস শুক্কুর সিআইপি বলেন, যদি সোনাদিয়ায় একটি আধুনিক শুটকি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা যায়, তবে এটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য রপ্তানি খাত। সোনাদিয়া দ্বীপের শুটকি শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে পারলে তা কেবল মহেশখালীর অর্থনীতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

