রাজনীতিতে রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় সমঝোতা একটি স্বীকৃত ধারণা। দীর্ঘ সংঘাত, রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর একটি দেশকে স্থিতিশীল করতে এর প্রয়োজন হতে পারে।
রাজনীতিতে রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় সমঝোতা একটি স্বীকৃত ধারণা। দীর্ঘ সংঘাত, রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর একটি দেশকে স্থিতিশীল করতে এর প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় রিকনসিলিয়েশন কতটা যৌক্তিক? জাতীয় সমঝোতার নামে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কোনো প্রচেষ্টা চলছে কি না, সে প্রশ্নই বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি এবং বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে রিকনসিলিয়েশনের কথা বলা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি উদার ও ইতিবাচক প্রস্তাব বলে মনে হতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাত কমানো, সামাজিক বিভাজন দূর করা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সমঝোতার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু রিকনসিলিয়েশন কেবল রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসানো কিংবা অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নাম নয়। কেননা, এর সঙ্গে জড়িত থাকে সত্য স্বীকার, দায় নির্ধারণ, ভুক্তভোগীদের প্রতি ন্যায়বিচার, অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। এসব শর্ত উপেক্ষা করে সমঝোতার আহ্বান জানানো হলে তা জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে উল্টো অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল এবং বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, এ সময়ে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ আহত হন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছিলেন। প্রতিবেদনটি শুধু হতাহতের সংখ্যাই তুলে ধরেনি; বরং সহিংসতার প্রকৃতি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় সম্পর্কেও গুরুতর পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলোর পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার বিষয়ে যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের ফল, যেখানে ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সূত্রের সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সুতরাং এ প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে এর গুরুত্ব খাটো করে দেখা দায়িত্বশীল অবস্থান হতে পারে না। বরং প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। একটু ভেবে দেখা দরকার, প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর সম্ভাব্য হিসাব কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাতের পরিসংখ্যান নয়। এর সাথে সরাসরি জড়িত হয়ে আছে অসংখ্য পরিবার, যাদের সন্তান আর ঘরে ফেরে নি; অসংখ্য মা-বাবা, যারা সন্তানের লাশ গ্রহণ করেছেন; এমন মানুষ, যারা গুলীতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা আজীবন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করছেন। তাদের কাছে রিকনসিলিয়েশন নিছক রাজনৈতিক পরিভাষা নয়। তাদের কাছে এটি ন্যায়বিচার পাওয়া কিংবা সে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রশ্ন।
জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের একটি অংশ মাত্র। দীর্ঘ শাসনামলে গুম, গোপন বন্দিশালা, নির্যাতন এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে এসব পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জুনে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১,৫৬৯টি গুমের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে বলে স্বীকার করা হয়। কমিশনের হিসাবে, এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৫১ জন তখনও নিখোঁজ ছিলেন; আরও ৩৬ জনের লাশ নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার করা হয়েছিল। কমিশন মনে করেছে, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা যাচাইকৃত অভিযোগের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের উত্তরাধিকার শুধু মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সরকারের সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এসব অর্জনের বয়ানের আড়ালে আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ জমতে থাকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্র থেকে জানা যায় যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ আনুমানিক ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্রের হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতিবছর অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। এতে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের বিভিন্ন ব্যক্তি, মধ্যস্বত্বভোগী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরা হয়।
এ বিপুল অঙ্কের অর্থের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে দেশের বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। যে দেশে বহু মানুষ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারেন না, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, যেখানে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন পড়ে; সেখানে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগ শুধু আর্থিক অপরাধের বিষয় নয়। এটি জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল তদারকির অভিযোগও এই সংকটের অংশ। কোনো গোষ্ঠী যদি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেয়, ঋণ পরিশোধ না করেও সুবিধা ভোগ করে কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়, তাহলে এর দায় কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার প্রশ্নও তদন্ত করতে হবে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ফিরে আসে: আওয়ামী লীগ নিজে কী চায়? দলটি কি তার দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত দমন-পীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগগুলোর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত? জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো মানুষ ও তাদের পরিবারের প্রতি দায় স্বীকার করার কোনো আন্তরিকতা কি দলটির মধ্যে দেখা গেছে? দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এমন কোনো সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশোচনা সামনে আসেনি, যা জাতীয় পুনর্মিলনের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। বরং গণঅভ্যুত্থানকে ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে পক্ষ আন্দোলনের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও মানুষের ক্ষোভকেই অস্বীকার করতে চায়, তার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হবে কীভাবে?
একটি রাজনৈতিক দল ভুল করতে পারে, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে, এমনকি গুরুতর অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখিও হতে পারে। কিন্তু সংকটের গভীরতা বাড়ে তখন, যখন সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব সে অভিযোগের মুখোমুখি না হয়ে সবকিছুকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিতে চায়। কারণ, অনুশোচনা ও দায় স্বীকারের প্রথম শর্ত হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে কিংবা তাদের অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার বলে আখ্যায়িত করে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। রিকনসিলিয়েশন যদি আন্তরিক হয়, তবে আওয়ামী লীগকে অতীতে কী ঘটেছে বলে তারা স্বীকার করে কিংবা কোন কোন বিষয়ে স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত- তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার বা নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ধামকি বন্ধ করতে হবে। কেবল দেশে ফেরার ঘোষণা, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগের মাধ্যমে এই আস্থার সংকট কাটানো যাবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের আরও কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও সমর্থকদের তৎপরতা, বিচ্ছিন্ন সহিংসতার অভিযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনার খবর রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলছে। পাশাপাশি, সম্প্রতি সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় দলটির কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের বিষয়ে তদন্তের প্রেক্ষাপটে আটক করার খবরও সামনে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে হবে। তবে এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা নিছক রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয় থাকবে না; বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার আগাম ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আকাক্সক্ষা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সে প্রত্যাবর্তন কোন রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। অতীতের কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যতে সহিংসতা ও কর্তৃত্ববাদ পরিহারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছাড়া কেবল দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে না।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও কিছু ঘটনা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিউইয়র্কে জেএফকে এয়ারপোর্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা করার ঘটনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা এবং জুলাই-সম্পর্কিত বিচারপ্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করতে বিদেশে লবিং ফার্ম নিয়োগের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক লবিং নিজে বেআইনি বা অগ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল বিদেশে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আপত্তি জানানো কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা, সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা কিংবা আদালতের রায়কে কোনো ধরনের আইনি পর্যালোচনা ছাড়াই অগ্রাহ্য করার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সে সাথে, প্রতিপক্ষের বা ভিন্ন চিন্তার মানুষকে দেশের বাইরে হেনস্তা করার মানসিকতাও সুস্থ কোনো মানসিকতা নয়। কেননা, এর মধ্য দিয়ে দেশের ভাবমূর্তিও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ক্ষুণ্ন হয়।
এখানেই রিকনসিলিয়েশন বিতর্কের কেন্দ্রীয় সংকটটি স্পষ্ট হয়। যে রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, তার পক্ষ থেকে যদি অতীতের দায় স্বীকার, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকারের দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকে, তাহলে সমঝোতার আহ্বান বাস্তবে কোন লক্ষ্য পূরণ করবে? জাতীয় সমঝোতা কখনো একতরফা হতে পারে না। যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যারা স্বজন হারিয়েছেন, যারা বছরের পর বছর রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও ন্যায়বিচারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে সমঝোতার কাঠামো তৈরি করা হলে তা হবে ভুক্তভোগীদের প্রতি আরেক ধরনের অবিচার। সুতরাং আজ রিকনসিলিয়েশনের পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদেরও স্পষ্ট করতে হবে, তারা কোন্ ধরনের সমঝোতা চান। সত্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পুনর্মিলন, নাকি অতীতের দায় উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ? এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য মৌলিক বিদ্যমান। প্রথমটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়টি জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগকে অর্থহীন করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। আমরা কোন দিকে অগ্রসর হবো- চূড়ান্ত সে সিদ্ধান্তটি নিতে হবে নীতি নির্ধারকদেরই।
