হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা পেটের অস্বস্তিতে ভোগেন অনেকে। অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে অনেকেই দামি সাপ্লিমেন্ট বা কঠোর খাদ্যাভ্যাসের কথা ভাবেন। তবে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা পরিচিত কিছু খাবারও পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
অন্ত্রের কাজ শুধু খাবার হজম করা নয়। নিয়মিত মলত্যাগ, খাবার থেকে পুষ্টি উপাদান শোষণ এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে আঁশসমৃদ্ধ খাবার, উপকারী অণুজীব এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরি।
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত খাওয়ার উপযোগী আটটি পরিচিত খাবারের কথা জানিয়েছেন। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেগুলো কী কী।
১. মধু ও দই
দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, মধুতে থাকা কিছু উপাদান এসব ব্যাকটেরিয়ার টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ডা. শেঠির উল্লেখ করা ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় কৃত্রিমভাবে তৈরি হজমপ্রক্রিয়ার পরিবেশে দইয়ের প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার টিকে থাকার ক্ষেত্রে মধুর সম্ভাব্য উপকারিতা দেখা গেছে। এ জন্য তিনি জীবিত উপকারী ব্যাকটেরিয়াযুক্ত সাধারণ দইয়ের সঙ্গে অল্প মধু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে এই ফলাফল থেকে মানুষের শরীরে একই ধরনের উপকার নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
২. এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলও খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। এতে রয়েছে পলিফেনল নামের উদ্ভিজ্জ উপাদান, যা অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া অলিভ অয়েলের কিছু উপাদানের প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি গ্রহণ করলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
সবজি, সালাদ কিংবা রান্না করা খাবারের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায়।
৩. রসুন
রসুন শুধু খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বাড়ায় না, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও সহায়ক হতে পারে। এতে রয়েছে ফ্রুকট্যান নামের একধরনের কার্বোহাইড্রেট, যা প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, অন্ত্রের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া এই উপাদানকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে যাদের ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রসুন খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অন্যান্য উপসর্গ বাড়তে পারে। এমন সমস্যা হলে রসুনের পরিমাণ কমানো কিংবা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ডার্ক চকলেট
অন্তত ৭০ শতাংশ কোকোযুক্ত ডার্ক চকলেটে রয়েছে পলিফেনল, যা অন্ত্রের অণুজীবের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কোকোর এসব উপাদান অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম এবং বৈচিত্র্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে ডার্ক চকলেটেও ক্যালরি ও চর্বি থাকে। তাই অতিরিক্ত না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
৫. কিউই ফল
কিউই ফলে রয়েছে খাদ্য আঁশ, যা মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ডা. শেঠি জানান, একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণায় প্রতিদিন দুটি সবুজ কিউই খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ও পেটের অস্বস্তি কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কিউইয়ের আঁশ মলের গঠন ও চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
৬. গাজর
গাজর আঁশসমৃদ্ধ একটি পরিচিত সবজি। এর খাদ্য আঁশ হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করতে পারে।
কাঁচা কিংবা রান্না করে—দুইভাবেই গাজর খাওয়া যায়। প্রতিদিনের খাবারে গাজর রাখলে শরীরে আঁশের চাহিদা পূরণেও সহায়তা মিলতে পারে।
৭. আপেল
আপেলে রয়েছে পেকটিন নামের দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে এবং হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আপেলের খোসাতেও খাদ্য আঁশ ও পলিফেনল রয়েছে। তাই ভালোভাবে ধুয়ে খোসাসহ আপেল খেলে এসব উপাদান পাওয়া যায়।
ফল খাওয়ার আগে পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। ভিনেগার মেশানো পানি দিয়ে ধোয়া বাধ্যতামূলক নয়।
৮. কাঁচা বা কম পাকা কলা
কাঁচা কিংবা কিছুটা কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ নামের একধরনের শ্বেতসার থাকে। এটি সাধারণ শ্বেতসারের মতো ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম হয় না; বরং বৃহদন্ত্রে পৌঁছে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
এই প্রক্রিয়ায় স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে, যা অন্ত্রের কোষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাকা কলার তুলনায় সবুজ বা কম পাকা কলায় সাধারণত রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকে।
তবে যাদের হজমে সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের খাবার খাওয়ার পরিমাণ ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো।
অন্ত্রের সুস্থতায় কী মনে রাখবেন?
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিদিন পর্যাপ্ত আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, প্রয়োজনমতো পানি পান এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটব্যথা, পেট ফাঁপা কিংবা মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, এসব উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই সব সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
সূত্র- এনডিটিভি