এল নিনোর দাপটে ধুঁকছে দেশ তথা বিশ্ব। তার জেরেই তীব্র জলের সঙ্কট তেলঙ্গানায়। ট্যাঙ্কারের সাহায্যে ধানজমিতে জল দিতে হচ্ছে কৃষকদের। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অক্টোবর মাসে রাজ্যে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি প্রায় ৯৫ শতাংশ। জলাধারগুলিতে জলস্তর তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ৩১৫টি মণ্ডলে খরা পরিস্থিতি ঘোষণা করে প্রায় দু’হাজার কোটি টাকার সাহায্য পাঠানোর কথা ভাবছে সরকার। এই কৃষিসঙ্কটের আবহেই তেলঙ্গানার রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তরজা। কংগ্রেস সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় তুলেছে প্রধান বিরোধী দল।
হনুমাকোন্ডা জেলার হসনপর্থী মণ্ডলের অনন্তসাগর গ্রামের কৃষক শ্যামসুন্দর রেড্ডী আট একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও সেচের জলের অভাবে ফসল বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে চারটি জলের ট্যাঙ্কার ভাড়া করে জমিতে জল দিচ্ছেন তিনি। একই ছবি মনচেরিয়ল জেলার নেন্নেল মণ্ডলের বোপ্পারাম গ্রামেও। কৃষক পাল্লে নরসইয়া তাঁর পাকা ধান বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় জলের ট্যাঙ্কার ভাড়া করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘লাভ হোক বা না হোক, পাকা ফসল তো চোখের সামনে নষ্ট হতে দিতে পারি না।’’ কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সেচের জলের অভাবে আজ গ্রামীণ অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলার মুখে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (আইএমডি) তথ্য বলছে, গত ১ থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে তেলঙ্গানায় মাত্র ৩.৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। স্বাভাবিক ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টির তুলনায় তা প্রায় ৯৫ শতাংশ কম। এমনকি রাজ্যের ১২টি জেলায় এই সময়ে একফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। এর আগে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার সময়ও ১৭ শতাংশ ঘাটতি ছিল। শুধু তা-ই নয়, সেচ দফতরের তথ্য অনুযায়ী কৃষ্ণা ও গোদাবরী অববাহিকার জলাধারগুলিতে গত বছরের তুলনায় জলের সঞ্চয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গিয়েছে। রাজ্য সরকার এখনও পর্যন্ত রাজ্যের ৩১৫টি মণ্ডলকে খরাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ১০১টি অত্যন্ত গুরুতর এবং ২১৪টি মাঝারি রকমের ক্ষতিগ্রস্ত। বিপর্যস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ১৯৮৬.৮৯ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎসঙ্কটও। সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে রাজ্যে। গত ৯ সেপ্টেম্বর তেলঙ্গানায় সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৫৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এই অবস্থায় সেচ ও বিদ্যুৎ নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়ছে।
কৃষকদের এই দুর্দশা এবং খরা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ চড়তেও সময় লাগেনি। ভারত রাষ্ট্র সমিতির (বিআরএস) কার্যনির্বাহী সভাপতি কে টি রাম রাও কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এল নিনো সংক্রান্ত পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও গোদাবরী ও কৃষ্ণার জল সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে এবং লিফট ইরিগেশন প্রকল্পগুলি সচল রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে রেবন্ত রেড্ডীর সরকার। সরকারের তরফে ব্যবস্থাপনার এই অভাবকেই কৃষকদের বর্তমান দশার জন্য দায়ী করেছেন তিনি।
একদিকে জলের অভাব, অন্যদিকে ফসলের মরসুমে আকাশছোঁয়া খরচ—সব মিলিয়ে তেলঙ্গানার কৃষি ও গ্রামীণ জনজীবন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
