Published on
:
2 min read
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টার তৈরির প্রতিযোগিতা। কিন্তু প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির মূল্য যদি দিতে হয় প্রকৃতিকে, তা হলে সেই উন্নয়ন কতটা যুক্তিসংগত? ফিনল্যান্ডে গুগলের ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা ঘিরে এখন উঠছে এমনই প্রশ্ন। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত মূল্যায়ন সম্পূর্ণ না করেই উত্তর ফিনল্যান্ডের একটি বিশাল বনাঞ্চলের প্রায় আড়াই লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ঘটনাটি সামনে আসতেই ক্ষোভ ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কর্তৃপক্ষ আপাতত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বন কেটে তৈরি হচ্ছে ডেটা সেন্টার
ফিনল্যান্ডের মুহোস শহরের কাছে প্রায় ৩৩০ হেক্টর জমিতে গুগলের ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা ছিল। অভিযোগ, এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ২.৫ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। শুধু গাছই নয়, সরিয়ে ফেলা হয়েছে জমির উপরের মাটির স্তরও। ফলে একসময়ের সবুজ বনভূমি এখন পরিণত হয়েছে কাদা, জল জমে থাকা গর্ত এবং গাছের শিকড়ে ভরা বিস্তীর্ণ এলাকায়।
পরিবেশকর্মীদের দাবি, এই এলাকা থেকে বয়ে যাওয়া বাদামি রঙের জল কাছের একটি জলধারায় মিশছে, যা পরে ওলুজোকি নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে জলদূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কেন বন্ধ হল নির্মাণকাজ?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডের লাইসেন্সিং অ্যান্ড সুপারভিশন অথরিটি প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পূর্ণ না করার কারণে মুহোস এবং ওটানমাকি এলাকার প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
ওটানমাকি এলাকাতেও প্রায় ১.৫ লক্ষ গাছ কাটা হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের অনুমান। অর্থাৎ, দুই এলাকা মিলিয়ে প্রায় চার লক্ষ গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে।
গুগলের ফিনল্যান্ড শাখার প্রধান আন্তি জারভিনেন এই বন কাটার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সংস্থার বক্তব্য, তৎকালীন আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই কাজ করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ার পর নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে গুগল।
বন্যপ্রাণীর বাসস্থানেও প্রভাব
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারাচ্ছে। ওটানমাকিতে নেকড়েদের লোকালয়ে চলে আসার কথাও জানিয়েছেন এক বাসিন্দা। বনাঞ্চলে বাসা বাঁধা বিরল তিন-আঙুলের কাঠঠোকরার মতো পাখিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি পরিবেশবিদদের।
এ ছাড়া নির্মাণকাজের শব্দ, জলদূষণ এবং এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
AI-এর উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রক্ষা
ফিনল্যান্ডে গুগলের এই প্রকল্প বৃহত্তর AI পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগের অংশ। দেশটির ঠান্ডা আবহাওয়া, জমির প্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ডেটা সেন্টার তৈরির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। সরকারও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য এত বড় পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? গুগল মুহোসে ১৩০ হেক্টর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। কিন্তু পরিবেশকর্মীদের মতে, এত বড় বন ধ্বংসের ক্ষতি পূরণে এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। AI-এর ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতি কতটা মেনে নেওয়া যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে ফিনল্যান্ড।
