‘অচেনা’ বাদীর মামলা: মরেও গালি শুনছেন জুলাইয়ের নিহত এমদাদ!
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর বাড্ডায় প্রাইভেটকার চালক এমদাদুল হক নিহতের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। তবে এই মামলার আসামির তালিকা এবং খোদ মামলার বাদীকে ঘিরেই.....
জার্নাল ডেস্কজুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর বাড্ডায় প্রাইভেটকার চালক এমদাদুল হক নিহতের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। তবে এই মামলার আসামির তালিকা এবং খোদ মামলার বাদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। নিহত এমদাদের পরিবারের দাবি, মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম তাদের কোনো আত্মীয় নন। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এলাকার কিছু নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসাতেই এমদাদের মৃত্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এই ‘অচেনা’ বাদী।
নিহত এমদাদ এবং মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম দুজনেরই গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানার ধাওয়া গ্রামে। মামলায় সাইফুল নিজেকে এমদাদের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দিলেও এমদাদের মা মোসাম্মৎ হাসিনা বেগম তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে হাসিনা বেগম বলেন, "আমরা কোনো মামলা করিনি। পরে জানতে পেরেছি পাশের এলাকার এক লোক মামলা করেছে। মামলা করার আগে তাকে আমরা চিনতামও না। সে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলাকার কিছু মানুষকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। ওই লোকগুলো ঘটনার সময় গ্রামে ছিল, অথচ তাদের নামে ঢাকায় হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। নিজের শত্রুতা মেটাতে সে আমার ছেলের নাম ব্যবহার করেছে। এর ফলে গ্রামের মানুষের কাছে আমার ছেলেটা মরেও গালি শুনছে।"
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামলার বাদী সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এড়িয়ে যান। ‘সাক্ষাতে মামলার বিষয়ে কথা বলবেন’ জানিয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
গত ২০ জুলাই বাড্ডার এ এম জেড হাসপাতালের সামনের রাস্তায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এমদাদ। এ ঘটনায় গত ৯ সেপ্টেম্বর ১২১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১০০-২০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে মামলা করেন সাইফুল।
তদন্ত শেষে অক্টোবরের প্রথমার্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, কেবল তাদেরই চার্জশিটভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনা ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আসাদুজ্জামান নূর, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক এমপি মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানসহ ৪৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে এজাহারে নাম থাকলেও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতউল্যাহ, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামসহ ৭৭ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, নির্দেশদাতা আসামিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তাদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় এমদাদের কপালে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নিহত এমদাদ ছিলেন পরিবারের তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ঢাকায় ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করে মা হাসিনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, "ছেলে মারা যাওয়ার আগের দিন রাতেও আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। পরদিন সকালে শুনি সে আর নেই। মামলা করে কী করব? ছেলে কি আর ফিরে আসবে? কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, আল্লাহর কাছেই এর বিচার দিয়ে রেখেছি। কিন্তু যে অযাচিতভাবে মামলা করেছে, তার কারণে এলাকার নিরপরাধ মানুষ আমাদের দুষছে। সন্তান হারানোর এই কষ্ট যেন আর কোনো মাকে সইতে না হয়।"
বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ
