“রাজা একদিন সভায় বসেছেন—চারিদিকে তাঁর পাত্র-মিত্র আমির ওমরা সিপাই শান্ত্রী গিজ গিজ করছে—এমন সময় কোথা থেকে একটা দাঁড়কাক উড়ে এসে সিংহাসনের ডান দিকে উঁচু থামের ওপর বসে ঘাড় নিচু ক’রে চারিদিক তাকিয়ে, অত্যন্ত গভীর গলায় বলল,“কঃ”।” ছোটবেলায় সুকুমার রায়ের ‘দ্রিঘাংচু’ কে পড়েনি? এক আশ্চর্য দাঁড়কাক কিংবা দণ্ডবায়স রাজসভায় স্রেফ একটা ছোট্ট ডাক ডেকে কী ‘বিপ্লব’ ঘটিয়েছিল তা সকলেরই জানা। এর নেপথ্যে যে কথাই থাক, সুকুমার রায় যে তাঁর এই গল্পে অন্য কোনও পাখিকে না রেখে কেন কাককেই বেছে নিয়েছিলেন তা অনুমান করা শক্ত নয়। আপাত ভাবে কাকেরা, অন্তত পাতিকাক, আমাদের চৌহদ্দিতে নিত্য ঘুরে বেড়ালেও তাদের ঘিরে একটা রহস্য সব সময়ই ছিল। সেই রহস্য তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে থাকা দীপ্তির।
সেই কবে ঈশপ তাঁর কাহিনিমালায় সংযুক্ত করেছিলেন কলসিতে ঢিল ফেলে কাকের জল তুলে আনার গল্প। বুদ্ধিমান পাখি বলতে তিনিও কিন্তু কাককেই বেছেছিলেন। হালফিলের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, কাকেরা সম্ভবত মানুষের থেকেও বহুগুণ দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে! ‘সম্ভবত’, কেননা আরও গবেষণা ছাড়া এই বিষয়ে পাকা কথা বলা যাবে না। তবে কাকেদের বুদ্ধি নিয়ে কোনও সংশয় তখনও ছিল না, এখনও নেই। এই দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের চমকে দিয়েছে কাকেরা। বারবার। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা যা বলেছে তা যেন নতুন করে চমকে দিচ্ছে। সেটার কথাই আগে বলা যাক।
দিনদুয়েক আগে ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে একটি গবেষণাপত্র। সেখানে বলা হয়েছে, দু’টি কাককে নিয়ে চলা এক গবেষণার কথা। এই কাক দু’টি অবশ্য আমাদের চেনা পাতি কাক নয়। পশ্চিম ইউরোপের বাসিন্দা এই ক্যারিয়ন ক্রো বেশ বলিষ্ঠ গড়নের। তা সেই কাকেরা নাকি একটা স্ক্রিনে চলমান ডট বা বিন্দুগুলির দিক শনাক্ত করতে সাকুল্যে ২৩৫ মিলিসেকেন্ড নিয়েছে। অর্থাৎ সেকেন্ডের হিসেবে ০.২৩৫ সেকেন্ড! পুরনো গবেষণা থেকে তথ্য তুলে দেখানো হচ্ছে, মানুষের নাকি তা বুঝতে লেগে যায় ৬ সেকেন্ড! গবেষকরা বলছেন, পাখিগুলি তাদের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ছিল নির্ভুল। এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের রেকর্ড থেকে বোঝা যায়, এদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রাইমেট ও মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মতোই। তবে এই নিয়ে এখনও অনেক গবেষণার প্রয়োজন। একে তো দু’টো মাত্র কাককে দেখে সবটা বোঝা যাবে না। তাছাড়া অন্য আরও সব প্রজাতির পাখি ও পশুর উপরেও পরীক্ষা চালালে সেক্ষেত্রে তুলনামূলক ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে।
কিন্তু সেসব পরের ব্যাপার। আপাতত যা বোঝা যাচ্ছে তাও কম বিস্ময়কর কি? তবে কাক নিয়ে এই প্রথম গবেষণা হল তা নয়। আগেও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, কাক তার শত্রুর মুখ মনে রাখতে পারে। এমনকী, সুযোগ পেলে প্রতিশোধও নেয়। কলসি থেকে জল তোলার সেই প্রাচীন কিন্তু স্রেফ কল্পনা নয়। কাকের কাছে সব কিছুরই সাধ্যমতো ‘জুগাড়’ থাকে। অর্থাৎ কোনও সমস্যায় পড়লে নাগালে যা থাকবে তা দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা এমনকী খাবার সঞ্চয় করে রাখার মতো ‘বিষয়ী’ও বটে তারা!
এই পর্যবেক্ষণ যে কেবল হালফিলের নয়, তা বুঝেছিল প্রাচীন যুগের মানুষও। সম্ভবত এই বুদ্ধির দীপ্তির কারণেই কাক হয়ে উঠেছিল রহস্যময়ও। অন্য পাখিদের মতো রঙের বাহার নেই। আদ্যন্ত কালো রঙের একটা পাখি, কিন্তু বুদ্ধিতে সে বাকিদের ছাপিয়ে যায়। মানুষকে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তারা। স্বাভাবিক ভাবেই এর ফলেই রহস্যের আলো এসে পড়েছে কাকের উপরে। সুরেশ চৌধুরী সংকলিত ‘বৃহৎ খনার বচন ও কাক চরিত্র’ গ্রন্থটিতে পাচ্ছি কাক-চরিত্র বা কাক-তন্ত্রের কথা। সেখানে বলা আছে, ‘কাকস্য চরিত্র কর্ম্ম যথোক্তং মুনিভাষিতম্।/ যস্য বিজ্ঞান মাত্রেণ সর্বতত্ত্বং লভেমরঃ’… অর্থাৎ কাক-চরিত্র শাস্ত্র শিখতে পারলে সব বিষয়েই জ্ঞান লাভ করা যায়। এরপর কাকের বিভিন্ন সময়ের ডাক, ডাকের চরিত্র, কোন কোণ থেকে সে ডাকছে, তার উপরে নির্ভর করে নানা ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। বলা হচ্ছে, ভোরে যদি পূর্বদিকে কাক ডেকে ওঠে, তাহলে যে শুনবে তার ধনসম্পদ প্রাপ্তি হবে। আবার ভোরে যদি পশ্চিমে কাকের ডাক শোনা যায়, তবে যে শুনছে সে নারীর দ্বারা উপকৃত হবে। ভোরে দক্ষিণ কোণ থেকে কাক ডাকার মানে রাজদণ্ডের মুখে পড়া, কিংবা কোনও অন্য দুঃসংবাদ শোনা। এমনই নানা… এমন সব কথা কেউ মানতে পারেন, কেউ বা নাও মানতে পারেন। বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু এই বিশ্বাসের উৎপত্তির নেপথ্যে যা আছে, তাকে অনুধাবন যে কেউই করতে পারেন। আর তা করলেই স্পষ্ট হয়, বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবেই কাককে দেখা হয়েছে বরাবরই। যা তাকে দিয়েছে রহস্যময়তাও।
অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের ‘কাকেশ্বর কুচকুচে’ নিবন্ধে উল্লেখ পাচ্ছি দ্রোণকাকের কথা। দাঁড়কাকের চেয়েও আকারে বড় সেই পাখি নাকি মরজগৎ থেকে পিণ্ড নিয়ে পাড়ি দেয় অন্য ভুবনে! আবার দশমহাবিদ্যার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময়ী ধূমাবতীর বাহনও কাক। কাক আর রহস্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে বসলে এই সব কথা আমাদের নাড়াচাড়া করতেই হবে। বোঝা যায়, এমনি এমনি এই পাখিটিকে ঘিরে এভাবে রহস্যের বলয় গড়ে তোলা হয়নি। আজকের বিজ্ঞানীরাও বিস্মিত হচ্ছেন তাদের ‘প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব’ দেখে। এহেন আশ্চর্য বুদ্ধিমান হয়েই কাকেরা নিজেদের পালকে গুঁজে রেখেছে অনির্বচনীয় রহস্যময়তা। এত স্বল্পে এই বায়স-কাহিনি বলা যায় না। এই লেখায় আমরা স্রেফ সেই বিস্ময়কে ছুঁয়ে দেখলাম মাত্র।
