সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। কিন্তু এই উৎসবকে কেবল একটি ধর্মীয় আচারের গণ্ডিতে আটকে রাখলে এর প্রকৃত মহিমা বোঝা যাবে না। দুর্গা পূজা হলো বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অপূর্ব মিলনমেলা।
দুর্গা পূজার ঐতিহাসিক পটভূমি:
বাংলায় দুর্গা পূজার ইতিহাস বহু প্রাচীন। ইতিহাস বলে, ১৫৮০ সালে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গা পূজার আয়োজন করেন। আবার কারো মতে ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার প্রথম শারদীয় দুর্গা পূজার প্রচলন করেন। এরপর ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে যে পূজার আয়োজন করেন, সেখান থেকেই বারোয়ারি বা সার্বজনীন পূজার সূত্রপাত। সেই থেকে এটি আর শুধু রাজা-জমিদারের পূজা থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে বাংলার সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব।
হিন্দু দর্শন ও বাঙালি সংস্কৃতির মিলন:
দেবী দুর্গা হলেন শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক। বাঙালির কাছে দুর্গা পূজা আবার কন্যার আগমন। কৈলাস থেকে চার সন্তান — লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশকে নিয়ে উমা যখন বাপের বাড়ি আসেন, তখন বাংলার ঘরে ঘরে সেই আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি, ধূপের গন্ধ, নতুন জামা, সিঁদুর খেলা — সব মিলিয়ে এটি বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
২০২৬-এর প্রেক্ষাপট ও সরকারের ভূমিকা :
এ বছর ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গোৎসব বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আজ ১৪ অক্টোবর ২০২৬, পূজার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। সরকার এবার যে গুরুত্ব দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০ অক্টোবর মহানবমীতে নির্বাহী আদেশে ছুটি, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে সাধারণ ছুটি এবং ২২ অক্টোবর অতিরিক্ত ছুটি শুক্র-শনিবারসহ টানা ৫ দিনের ছুটি। সারাদেশে ৩৩ হাজারেরও বেশি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের শক্তি:
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। দুর্গা মণ্ডপের পাশে ঈদের শুভেচ্ছা, মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতের একসাথে শুভেচ্ছা বিনিময় — এটাই আমাদের আসল শক্তি।
আমাদের করণীয়:
প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোনো গুজব বা উসকানিমূলক প্রচারণা যেন আমাদের বন্ধন নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকা।
তরুণ প্রজন্মকে এই উৎসবের ইতিহাস ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা।
পরিশেষে দেশের সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনকে জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা।
শুভ শারদীয়া।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তক।
