ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান রনেন বার।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আক্রমণের আগে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় চাপানোর অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানহানির এই মামলা করেছেন সাবেক গোয়েন্দা প্রধান।
হামাসের ওই হামলার সময় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা 'শিন বেত'-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন রনেন বার।
আরও পড়ুন
বুধবার (১৪ অক্টোবর) তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তিন মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার) ক্ষতির দাবি জানিয়ে এই মামলা করেন।
নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছিলেন, রনেন বার গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য গোপন রেখেছিলেন এবং সৈন্য সতর্ক করা কিংবা ‘নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’-এর দর্শনার্থীদের সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বার এই অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখান করে দাবি করেন, নেতানিয়াহু আসলে নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধ থেকে সরানোর চেষ্টা করছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এর জবাবে গাজায় অব্যাহত সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৭৪ হাজার জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শিন বেত কর্মকর্তারা ৬ অক্টোবর গভীর রাতে হামাসের অস্বাভাবিক তৎপরতা নিয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেন এবং রাত ৩টা ৩ মিনিটে আনুষ্ঠানিক সতর্কতা জারি করেন। ৩টা ৫৫ মিনিটে নেতানিয়াহুর সামরিক সচিবালয়কে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়। বার আরও অস্বীকার করেন যে, নেতানিয়াহুর দাবিমতো তিনি ওই রাতে ইসরায়েলি সামরিক প্রধান বা সামরিক গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন।
হামাসের সেই হামলার ব্যাপ্তি ও সময়সীমা আগে থেকে সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারার দায় স্বীকার করে শিন বেত প্রধান হিসেবে নিজের ব্যর্থতা মেনে নিয়েছিলেন রনেন বার, যা পরবর্তীতে তার পদত্যাগেরও কারণ হয়।
তবে মামলায় রনেন বার জোর দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুকে হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অস্থিরতা শত্রুপক্ষকে উৎসাহিত করতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করা হয়েছিল। জুলাই মাসে তিনি ব্যক্তিগতভাবে একটি হামলার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিলেন। এছাড়া সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুতেও হামাসের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল।
বার আরও অভিযোগ করেন, হামাসের শীর্ষ নেতাদের দমনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব নেতানিয়াহু বারবার প্রত্যাখ্যান বা বিলম্বিত করেছেন এবং গাজায় ‘যেকোনো মূল্যে শান্ত পরিবেশ’ বজায় রাখার নীতি বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি মানবিক সহায়তা তহবিল হিসেবে কাতারের অর্থ হামাসের সামরিক শাখার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে-এমন সতর্কতা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু গাজায় কাতারি অর্থ আসা অব্যাহত রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন।
নেতানিয়াহু অবশ্য রনেন বারের এসব দাবি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, জরুরি প্রয়োজনে বার তার সঙ্গে নিরাপদ টেলিফোন লাইনে যোগাযোগ করতে পারতেন। জবাবে বার জানান, নেতানিয়াহু কখনোই তাকে তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেননি।
২০২৫ সালের মার্চে আস্থা হারানোর অজুহাতে নেতানিয়াহুর সরকার রনেন বারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট ওই বরখাস্তের আদেশকে বেআইনি ঘোষণা করলে বার নিজেই জুন মাসে পদত্যাগ করেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের আক্রমণের আগে নেতানিয়াহু বিদেশি সরকারগুলোর কাছ থেকেও সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি পত্রিকা ‘হাআরেৎজ’ রিপোর্ট করে যে, আক্রমণের ১০ দিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ হামাসের বড় ধরনের অভিযানের বিষয়ে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন। যদিও নেতানিয়াহুর কার্যালয় এটিকে 'সম্পূর্ণ মিথ্যা' বলে দাবি করেছে।
এছাড়া মিশরীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও হামলার বহু আগে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে হামাসের পরিকল্পনা সম্পর্কিত তথ্য থাকার কথা উঠে এসেছে। সূত্র: আরটি
আজহার/
