ছোট্ট পাহাড়, বিরাট নদী, একটা-দুটো গাছ, আমার দুর্গা জীবন পথে, ফুটিয়ে তোলেন সাজ! পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট হতে হতে হাসপাতালের শয্যার কাছে বন্দি হচ্ছিল নিরন্তর! প্রত্যেক মুহূর্তের হাসি-কান্নার হিল্লোলে তিনিও খুঁজছিলেন আলো। কিন্তু কোথায় কী! সুখের দুনিয়ায় অন্ধকারেই কাটছিল জীবন! এক যুগ আগের এক দুর্ঘটনা পঙ্গু করেছিল তাঁকে, কেউ আর ফেরায়নি বাড়িতে! সেই থেকেই আর জি করের সার্জারি বিল্ডিং তাঁর ঘরবাড়ি। এবার একাকী গোপালকে ঠাকুর দেখালেন আর জি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ারা!
বছর ৪৮-র গোপাল পাত্র। ২০১৪ থেকে কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বসবাস তাঁর। পশ্চিম মেদিনীপুরের জামবনির হামিরপুর এলাকার বাসিন্দার জীবন তছনছ হয় ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর। পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া থেকে কয়লা নিয়ে আসার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রাক। খালাসি গোপালের দুই পা পিষে যায় সুতাহাটার কাছে। তারপর পাঁশকুড়া হাসপাতাল থেকে আর জি করে আনা হয় গোপাল পাত্রকে। প্রায় শেষ হয় দুই পা। শরীরে গভীর চোট নিয়েও সেরে ওঠেন তিনি। তবে বহু আগে স্ত্রী-হারা গোপালের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। কেউ নিতে আসেননি তাঁকে। তারপর থেকে একটু সুস্থ হওয়ার পর, আর জি করেই হুইলচেয়ার আর শয্যায় সংসার পাতেন তিনি। যন্ত্রণাবিদ্ধ শরীরেই যেন বলে চলেন বাঁচার কথা!
বহু সুস্থ-অসুস্থ, হাসি-কান্নার দোলাচলে কেটে গিয়েছে ১২ বছর! এবার ভাগ্য খুলেছে তাঁর। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের স্নাতকোত্তর বিভাগের কয়েকজন পড়ুয়া মিলে অষ্টমীর দিন ঠাকুর দেখিয়েছেন তাঁদের আদরের ‘গোপালদা’কে। চিকিৎসক-পড়ুয়া ত্রিনেশ মণ্ডল, গৈরিক রায়, শ্রুতি সিং-রা মিলে হাসপাতালের আশপাশের পুজো মণ্ডপে ঘোরান তাঁদের রোগীকে। হাসপাতাল কর্মী গৌতমের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করেন ওঁরা। পুজোয় শত ব্যস্ততা পেরিয়েও গোপাল পাত্রের জীবনে স্বস্তি এনেছেন তিন চিকিৎসক-পড়ুয়া।
এমন অভিজ্ঞতায় আপ্লুত রোগী নিজেও। তাঁর কথায়, “ভাবতেও পারিনি আবার ঠাকুর দেখতে যাব। এই অবস্থায়, ডাক্তারবাবুরা যা করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ।” অন্যদিকে চিকিৎসক-পড়ুয়া ত্রিনেশ মণ্ডল বলছেন, “প্রায় ১২ বছর হাসপাতালেই আছেন গোপাল বাবু। অষ্টমীর দিন আমরা ভাবলাম এত কাজের মধ্যে একটু যদি সুযোগ পাওয়া যায়, ওঁকে নিয়ে বেরোই। তাতে ওঁর সম্মতি ছিল। ভালো লাগছে, এমন একটা কাজ করে, যে কাজ শুধু আমাদের নয়, আমাদের রোগীকেও আনন্দ দিয়েছে।”
