কালবেলা · রাজনীতি
পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন ঘিরে বরিশাল বিএনপিতে উত্তেজনা
১৮/১০/২০২৬

পক্ষ ত্যাগ করায় নিজ অনুসারীকে অপহরণ, স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় এবং মারধরসহ প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীনের বিরুদ্ধে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে বরিশাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন মহানগর বিএনপির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক দপ্তর সম্পাদক শরীফ ফিরোজ আহমেদ।
তবে এ ঘটনার পর একই স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক এই বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনের অনুসারীরা।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের যৌথ বালু ব্যবসার টাকা আত্মসাৎ করতে অন্যের চরিত্র হননের চেষ্টা করছেন সাবেক বিএনপি নেতা ফিরোজ আহমেদ।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন এবং অভিযোগ ঘিরে বরিশাল বিএনপিতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই গ্রুপ। বিরোধ বড় ধরনের দ্বন্দ্বে রূপ নেওয়ার শঙ্কা করছেন অনেকে।
জানা গেছে, রোববার বিকেল ৪টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন ২২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক শরীফ ফিরোজ আহমেদ। তিনি নিজেকে একসময় নাসরীনের অনুসারী বলে দাবি করেন।
লিখিত বক্তব্যে শরীফ ফিরোজ আহমেদ জানান, একসময় তিনি মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীনের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। পারিবারিক কিছু ঘটনায় নাসরীনের কাছ থেকে সুবিচার না পেয়ে তার বলয় থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। পরে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন শিকদারের সঙ্গে কয়েকজন নেতাকর্মীর সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর ফিরোজ আহমেদ ও তার স্ত্রীকে ফোনে গালিগালাজ এবং হুমকি দেন আফরোজা খানম নাসরীন।
ফিরোজ আহমেদের অভিযোগ, চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে নথুল্লাবাদ বাজার থেকে নাসরীনের অনুসারী পরিচয় দিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ধরে একটি অফিসকক্ষে নিয়ে মারধর এবং নাসরীনের রাজনৈতিক বলয় ত্যাগ করার কারণ জানতে চায়। এসময় মুঠোফোনে কল করে ফিরোজ আহমেদকে মারধরের নির্দেশ দেন নাসরীন।
এমনকি নাসরীনের স্বামী কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক নেতার নির্দেশের দোহাই দিয়ে ফিরোজ আহমেদের কাছে দুই লাখ টাকা পাওনা দাবি করে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
ফিরোজ বলেন, ‘ঘটনার পর এয়ারপোর্ট থানায় আমি অভিযোগ করেছি। পরে আদালতে মামলা করতে গেলে সেখান থেকে আমাকে অপহরণ করে থানায় নিয়ে যায় নাসরীনের অনুসারীরা। থানায় আটকে রেখে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি নাসরীন নিজেও থানায় গিয়ে আমাকে মারধর করতে উদ্যত হন। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে তিনি মারধরে ব্যর্থ হন এবং পরে আমার কাছ থেকে নেয়া স্ট্যাম্পটি ফেরত দেওয়ান পুলিশ কর্মকর্তারা।
নাসরীন ও তার অনুসারীরা এখনো প্রাণনাশের হুমকি এবং বাসায় লোক পাঠিয়ে হয়রানি করছে বলে দাবি করে ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘নাসরীন আমাকে কখনো ২২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবার কখনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে নিজের বলয়ে নিয়ে আসেন। তার যত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রত্যেকটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে যত অর্থের প্রয়োজন তার সব আমিই ব্যয় করেছি। এমনকি আমার বাসার রান্না করা খাবার পর্যন্ত তাকে নিয়মিত খাওয়ানো হয়েছে। যখন বুঝতে পারলাম তিনি প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করছেন তখন নাসরীনের বলয় ত্যাগ করেছি।
তাছাড়া ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালুর ব্যবসা নিয়ে নাসরীনের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই ব্যবসায় নিজের অংশীদারত্বের বাইরে নাসরীন তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করছেন। এসব ঘটনায় দলের হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং আফরোজা খানম নাসরীনদের বিচার দাবি করেন ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক এই নেতা।
এদিকে- শরীফ ফিরোজ আহমেদের সংবাদ সম্মেলনের পর বিকেল সাড়ে ৫টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন আফরোজা খানম নাসরীনের অনুসারীরা। এসময় নাসরীন নিজেও প্রেসক্লাবে উপস্থিত ছিলেন। তবে সংবাদ সম্মেলনে ক্যামেরার সামনে সামনে আসেননি তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নাসরীনের অনুসারী ২২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বালুভরাটের চুক্তিসংক্রান্ত অর্থ নিয়ে বিরোধ নিয়ে শরীফ ফিরোজ আহমেদ অন্যের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন। অথচ বিষয়টি আগেই মীমাংসিত হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, বালুভরাটের চুক্তির অর্থ ফিরোজ আহমেদের জিম্মায় ছিল। যেখানে ওয়ার্ডের ২০ থেকে ২২ জন দলীয় নেতাকর্মীর টাকা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ফিরোজ আহমেদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টাকা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন না। এ নিয়ে একাধিকবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠক হয়েছে। ফিরোজ কখনো টাকা খরচ হয়ে গেছে, আবার কখনো আংশিক টাকা দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ আহমেদ নিজেই টাকা পরিশোধের বিষয়টি স্বীকার করে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও টিপসই দেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে টাকা পরিশোধের কথা জানান। পরবর্তী সময়ে ১ অক্টোবর থানায় বসে ফিরোজ নিজেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।’
মনোয়ারের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে ঘিরে কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় নাসরীনকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন শিকদার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের প্ররোচনায় এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে ঘিরে কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ফিরোজ শরীফকে দিয়ে আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন শিকদার বলেন, ‘আমরা কাউকে প্ররোচিত করিনি। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি পক্ষ ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে।’
অন্যদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ নিয়ে কিছু বলার নেই। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাঁয়তারা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিএনপিতে সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, বিসিসির প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীন এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ- অন্য সকল গ্রুপের সাথে একাই গ্রুপিং করছেন আফরোজা খানম নাসরীন। জাতীয় এবং দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রেই একক আধিপত্য জানান দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
এমনকি নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে নগর উন্নয়নে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ, দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে অসাংগঠনিক আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে নাসরীনের বিরুদ্ধে। যা নিয়ে দলের মধ্যে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এ নিয়ে দলের হাইকমান্ডের স্থানীয় নেতারা একাধিক অভিযোগ দিলেও সমাধান হচ্ছে না বলে দলের নেতাকর্মীরা।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗