নড়াইলের বিভিন্ন বিলে ও নিম্নাঞ্চলে ছাড়পত্র ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের খননের অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ও সরকারি বিধানের তোয়াক্কা না করে খনন করা এ সব ঘেরের কারণে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নড়াইলের বিস্তীর্ণ তিন ফসলি কৃষি জমি এক বা দুই ফসলি জমিতে রূপ নিচ্ছে এবং হাজার হাজার একর জমি সারা বছর জলাবদ্ধ হয়ে অনাবাদি থাকছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকালে কৃষক ও স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে জানান, বিলের ভেতরের উন্মুক্ত স্থানে মাটি কেটে উঁচু বাঁধ নির্মাণ ও গভীর ঘের তৈরি করায় বর্ষাকালে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কুমড়ির বিল, চাচড়ীর বিল, পাটেরশরী বিল, আমাদার বিল, ঘাঘার বিল ও ইচ্ছামতির বিলসহ অন্তত ২০টি বিলের হাজার হাজার একর জমিতে ৫ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত পানি জমে থাকছে।
লোহাগড়া উপজেলার দিনোনাথ পাড়া গ্রামের কৃষক মশিয়ার রহমান জানান, এক সময় ইচ্ছামতি বিলে বছরে একাধিক বার ফসল হতো। কয়েক বছর পানিতে আটকে থাকায় এখন একটির বেশি ফসল চাষ করা যাচ্ছে না।
আমাদা বিলের কৃষক রইচ উদ্দীন টিপু ও ঘাঘার বিলের কৃষক মাসুদ পারভেজ বলেন, বিলে এত বেশি মাছের ঘের কাটার কারণে মধুমতি নদী থেকে আর পানি বিলে আসে না। এ কারণে অনেক জমি বছরের পর বছর অনাবাদি থাকছে। এখন আর বিলে তিন ফসল হয় না।
নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান জানান, তিন ফসলি জমিতে ঘের না করার জন্য চাষিদের নিয়মিত নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে তিনটি উপজেলায় ৫৭টি বিলে মোট ৫ হাজার ৩৯১টি মৎস্য ঘের রয়েছে। অন্তত ২০টি বিলে অপরিকল্পিত ঘের খননের কারণে ১০-১২ হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি এখন দুই ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া দুই হাজার হেক্টর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে।
নড়াইলের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল মালেক জানান, আইন অনুযায়ী ৫ একরের কম জমিতে ঘের খননে পরিবেশের ছাড়পত্র এবং ৫ একরের ওপরে হলে অবস্থান গত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক রয়েছে। তবে এ আইন কেউ মানছে না। জলাভূমি সংকুচিত হওয়ায় দেশীয় মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
লোহাগড়া সরকারি কলেজের কৃষি বিভাগের সাবেক প্রধান কৃষিবিদ ওবায়দুর রহান সেন্ট বলেন, পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির অন্যতম আশ্রয়স্থল হলো উন্মুক্ত বিল। বিলগুলোতে একাধিক ঘের কাটায় নিরাপদ খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে পাখির আগমন ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি শাহ আলম বলেন, উন্মুক্ত জলাশয় কেবল মাছ চাষের জায়গা নয়, ঘের কাটার কারণে জমিগুলো ব্যক্তির দখলে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার হারাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আরিফুল রহমান বলেন, কৃষি জমিতে ঘের করতে হলে শ্রেণি পরিবর্তন ও পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক রয়েছে। তবে এক শ্রেণির লোক সে আইন অমান্য করে ঘের খনন করে চলছে।
