আজকাল ওয়েবডেস্ক: রনজি ট্রফির ৯২ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে এক ইনিংসে ৪০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করলেন চিন্ময় সুতার। নাগাল্যান্ডের বিরুদ্ধে মিজোরামের হয়ে তাঁর অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংস শুধু রেকর্ডের পাতায় জায়গা করে নেয়নি, বরং দীর্ঘদিনের লড়াই, হতাশা এবং প্রত্যাখ্যান পেরিয়ে এক ক্রিকেটারের স্বপ্নপূরণের কাহিনিও সামনে এনেছে।
রনজি ট্রফিতে এর আগে এক ইনিংসে ৪০০-র বেশি রান করার কৃতিত্ব ছিল বিবি নিম্বালকরের। ১৯৪৮-৪৯ মরশুমে মহারাষ্ট্রের হয়ে কাথিয়াওয়াড়ের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৪৪৩ রান করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৭৭ বছর পর সেই তালিকায় নাম লেখালেন ২৯ বছরের চিন্ময়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০০৪ সালে ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৪০০ রানের পরও এটি বিরলতম কৃতিত্বগুলির অন্যতম।
চিন্ময়ের এই ইনিংসের বিশেষত্ব শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। সতীর্থরা একের পর এক ফিরে গেলেও উইকেটে টিকে থেকে দলকে বড় রানের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন তিনি। শেষ উইকেটে লালরেমপুইয়া চাকচুয়াকের সঙ্গে ১৮৯ রানের পার্টনারশিপ গড়েন চিন্ময়। রনজি ট্রফির ইতিহাসে শেষ উইকেটে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ জুটি।
একটা সময় মিজোরামের স্কোর ছিল ৩৫০/৮। সেখান থেকে দলের রান ৪৫০ পার করানোর লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট চালিয়ে যান চিন্ময়। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের পর চিন্ময় জানান, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচে ৯৯ রানে আউট হওয়ার পর শতরান পাওয়াটা তাঁর কাছে বড় স্বস্তির ছিল। এরপর তিনি আর ব্যক্তিগত রানের হিসাব করেননি। বরং ছোট ছোট পার্টনারশিপ গড়ে দলকে বড় স্কোরে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত ৪০০ রানে পৌঁছনোর পর মিজোরাম ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে। দলের স্কোর দাঁড়ায় ৫৮১ রান। দুই দলের ক্রিকেটারদের দাঁড়িয়ে অভিবাদনের মধ্যে সাজঘরে ফেরেন চিন্ময়।
মুম্বইয়ের মুলুন্ডে জন্ম চিন্ময়ের। তাঁর বাবা রাজেশ সুতারও মুম্বইয়ের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন। সাতটি রনজি ট্রফির ম্যাচ এবং ৩০টি লিস্ট এ ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফরের সময় মুম্বইয়ের হয়ে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে শচীন তেণ্ডুলকরের সঙ্গে ব্যাট করে শেন ওয়ার্নের দলের বিরুদ্ধে ৪৩ বলে ৪৫ রান করেছিলেন রাজেশ। সেই ম্যাচে শচীন অপরাজিত ২০৪ রান করেন।
ক্রিকেটের এমন পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠা চিন্ময়ের প্রথম পছন্দ ছিল লেগ স্পিন। তাঁর আদর্শ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি শেন ওয়ার্ন। পরে স্কুল ও ক্লাব ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে রান করার সুবাদে ব্যাটিংয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দেন তিনি।
মুম্বইয়ের অনূর্ধ্ব-১৪ এবং অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সম্ভাব্য ক্রিকেটারদের তালিকায় জায়গা পাওয়ার পর অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্বও দেন চিন্ময়। ২০১৯ সালে ভারতীয় এমার্জিং দলের হয়ে এসিসি এমার্জিং টিমস এশিয়া কাপে খেলেন তিনি। হংকংয়ের বিরুদ্ধে শতরানও করেছিলেন। কিন্তু এত সাফল্যের পরেও মুম্বইয়ের সিনিয়র দলে নিয়মিত সুযোগ পাননি।
মুম্বই প্রিমিয়ার লিগে ধারাবাহিক ভাল পারফরম্যান্স করেও সিনিয়র দলে জায়গা না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন চিন্ময়। ২০২৫ সালে মারাঠা রয়্যালসের হয়ে সাত ম্যাচে ২৭১ রান করে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন তিনি। পরের মরশুমেও ভাল পারফরম্যান্স করে প্রতিযোগিতার সর্বাধিক রান সংগ্রাহকদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে শেষ করেন।
তবু মুম্বইয়ের সিনিয়র দলের দরজা তাঁর জন্য খোলেনি। শেষ পর্যন্ত দল বদলের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
চিন্ময়ের কথায়, ধারাবাহিকভাবে রান করার পরেও মুম্বইয়ের সম্ভাব্য ক্রিকেটারদের তালিকায় জায়গা না পাওয়ায় তিনি অন্য দলের হয়ে খেলার কথা ভাবেন। সেই সময় মিজোরাম থেকে সুযোগ আসে এবং তিনি তা গ্রহণ করেন।
মিজোরামের ট্রায়ালে ডাক পাওয়ার সময় ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলছিলেন চিন্ময়। লন্ডন থেকে ভারতে এসে মাত্র দু’ঘণ্টার ট্রায়াল দিয়ে ফের ইংল্যান্ডে ফিরে যান তিনি। দু’সপ্তাহ পরে জানতে পারেন, মিজোরাম দলে নির্বাচিত হয়েছেন।
মুম্বই ক্রিকেটে অভিষেক নায়ার ও সিদ্ধেশ লাডের মতো ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন চিন্ময়। গত বছরের বিজয় হাজারে ট্রফিতে রোহিত শর্মার সঙ্গে একই সাজঘরে থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে স্মরণীয়।
তবে মুম্বইয়ে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এখনই কিছু ভাবতে চান না তিনি। চিন্ময়ের বক্তব্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে বর্তমানে মনোযোগ দেওয়াই তাঁর পছন্দ।
মিজোরাম বর্তমানে রনজি ট্রফির প্লেট গ্রুপে খেলছে। দলকে জয় এনে দেওয়া এবং এলিট ডিভিশনে উন্নীত হতে সাহায্য করাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার হতাশা এবং দল বদলের সিদ্ধান্ত, সবকিছুর পর ৪০০ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস চিন্ময় সুতারকে নতুন পরিচিতি দিয়েছে। যে ক্রিকেটার একসময় মুম্বইয়ের সিনিয়র দলে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তিনিই এখন রনজি ট্রফির ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন।
