একই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, লাল কাঁকড়ার বিচরণ, লেম্বুর বনের সবুজ, রাখাইন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর বৌদ্ধ মন্দিরের ঐতিহ্য সব মিলিয়ে কুয়াকাটা যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অনন্য ছবি। এই সাগরকন্যাকে নতুন করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে দীর্ঘ ৯ বছর পর আয়োজন করা হচ্ছে ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬’।
আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী এ উৎসব ঘিরে কুয়াকাটায় তৈরি হচ্ছে বর্ণিল আয়োজন। সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত, ফ্যাশন শো, কমেডি অনুষ্ঠান, ঘুড়ি উৎসব, পিঠা উৎসব, বিচ ম্যারাথন ও চর বিজয় ভ্রমণ। সবকিছু মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য সাজানো হচ্ছে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। উৎসবের পরদিন ২৫ অক্টোবর থাকছে ‘ক্লিন কুয়াকাটা’ কর্মসূচি।
বিজ্ঞাপন

আয়োজকদের পরিকল্পনায় এবারের কার্নিভাল কেবল একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নয় বরং কুয়াকাটাকে সমুদ্রসৈকতের পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রকৃতি, ঐতিহ্য, খাবার, সংস্কৃতি ও আধুনিক বিনোদনের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
সমুদ্রসৈকত ছাড়িয়ে কুয়াকাটার বহুমাত্রিক পরিচয়
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য কুয়াকাটা। পর্যটকদের কাছে এর সবচেয়ে বড় পরিচিতি একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ। তবে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা শুধু সমুদ্রসৈকতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ অঞ্চলের লেম্বুর বন, গঙ্গামতি, লাল কাঁকড়ার চর, রাখাইন পল্লি, বৌদ্ধ মন্দির, স্থানীয় কৃষি, খাবার ও জীবনধারা পর্যটনের নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সমুদ্রকেন্দ্রিক ভ্রমণের পাশাপাশি প্রকৃতি, ইতিহাস, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যকে একসঙ্গে উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে এখানে।
কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ এর পরিকল্পনায় এই বৈচিত্র্যকে বিশেষভাবে তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বিনোদনের সমন্বয় ঘটিয়ে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ানো এবং কুয়াকাটার প্রতি আগ্রহ আরও বিস্তৃত করাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
কার্নিভালের মাধ্যমে পর্যটকরা শুধু সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখবেন না; বরং স্থানীয় মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, খাবার, খেলাধুলা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিজ্ঞাপন
তারকাদের উপস্থিতিতে জমবে উৎসব
কার্নিভালের অন্যতম বড় আকর্ষণ জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, উপস্থাপক, ফ্যাশন মডেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখদের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা। প্রীতম হাসান, ঐশী, হাসান, আরমান আলিফ, চিশতী বাউল থাকবেন অনুষ্ঠানে।
বিজ্ঞাপন

সংগীতের পাশাপাশি থাকছে নৃত্য পরিবেশনা, ফ্যাশন শো ও কমেডি অনুষ্ঠান। সাদ্দাম মাল ও তার দলের কমেডি নাটক এবং ঢাকার শিল্পীদের পরিবেশনারও সূচি রয়েছে।
অভিনয় ও বিনোদন জগতের প্রচারিত তালিকায় রয়েছেন সিয়াম আহমেদ, কেয়া পায়েল, বিদ্যা সিনহা মিম, নোমানী, চাষী ভাই ও হাবু ভাই। তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হলে উৎসবের তারকাবহুল আয়োজন আরও সমৃদ্ধ হবে।
উপস্থাপনা, ফ্যাশন শো ও ইনফ্লুয়েন্সারদের আয়োজন
বিজ্ঞাপন
উৎসবের মঞ্চে উপস্থাপনার দায়িত্বে থাকার তালিকায় রয়েছেন শান্তা জাহান, ইভান এবং সাদিয়া রশনি সূচনা। তাদের উপস্থাপনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিনোদন পর্ব পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যাশন শোতে অংশ নেওয়ার তালিকায় রয়েছেন আঁখি আফরোজ, সৈয়দ রুমা ও আফরিনা রাজিয়া তৃণা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে ডানা ভাই ও বারিশা হকের নাম রয়েছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যটন প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত, স্থানীয় খাবার, দর্শনীয় স্থান ও ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বিচ ফুটবল, ঘুড়ি উৎসব ও শিশুদের আনন্দ
২৩ অক্টোবর সকাল ৯টায় বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ও স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কার্নিভালের প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. সামীমুজ্জামান উদ্বোধনী বক্তব্য রাখবেন।
বিজ্ঞাপন
চর বিজয়, ফাতরার চর, গঙ্গামতি, লাল কাঁকড়ার চর, চর হেয়ার, সোনার চর, হরিণঘাটা ও কাউয়ার চরকে ঘিরে দলভিত্তিক বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।

বিকেলে লেম্বুর বনে ঘুড়ি উৎসব ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা বিকাশের পাশাপাশি প্রকৃতি ও সমুদ্রের সঙ্গে তাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
সন্ধ্যায় কুয়াকাটার সৌন্দর্য নিয়ে পুঁথিপাঠ, স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা, নৃত্য, ফ্যাশন শো এবং কমেডি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা বয়সি দর্শকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন থাকছে।
বিচ ম্যারাথন, সূর্যোদয় ও পিঠা উৎসব
কার্নিভালের দ্বিতীয় দিন ২৪ অক্টোবর ভোর ৫টায় কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতির চর পর্যন্ত বিচ ম্যারাথনের সূচি রয়েছে। ভোর ৫টা ৫৭ মিনিটে গঙ্গামতির চরে সূর্যোদয় দেখা এবং সকাল ৬টায় পিঠা উৎসবের আয়োজন রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পিঠা উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সৈকতে দৌড়, শরীরচর্চা ও প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা পর্যটনকে আরও বৈচিত্র্যময় করবে।
সকাল ৯টায় চর বিজয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে ভলিবল আয়োজনের সূচিও দেওয়া হয়েছে। বিকেল ৪টায় সেলিব্রেটি বিচ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাতে স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ফ্যাশন শো, কুয়াকাটার বিভিন্ন স্থান ও চর নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র, কমেডি শো এবং সংগীতানুষ্ঠান চলবে। রাত ১০টা ২০ মিনিটে পুরস্কার বিতরণ ও সম্মাননা এবং রাত ১০টা ৫৪ মিনিটে আতশবাজি ও সমাপনী ঘোষণার সূচি রয়েছে।
চর বিজয়: পরিচিত কুয়াকাটার বাইরে নতুন অভিযান
কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণ বাড়ানোর আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র চর বিজয়। সমুদ্রের বুকে অবস্থিত এই চরকে ঘিরে নতুন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জিরো পয়েন্ট থেকে সমুদ্রপথে চর বিজয়ের উদ্দেশে যাত্রা, দিগন্তজোড়া আকাশ, সাগরের ঢেউ ও নির্জন প্রকৃতির সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে স্পিডবোটে যাত্রার বিষয়টিও প্রচার করা হচ্ছে।
৩০টি স্টলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও রাখাইন সংস্কৃতি
কুয়াকাটা শুধু সমুদ্রের জন্য নয়, রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্যও পরিচিত। স্থানীয় জীবনধারা, বয়নশিল্প, খাবার, পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
কার্নিভালে ৩০টি স্টল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গামতি এলাকার জন্য চারটি স্টল এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের পণ্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার ব্যবস্থা থাকছে। স্থানীয় কৃষি, খাদ্যসংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনের সুযোগও এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পর্যটকরা সাধারণত কোনো গন্তব্যে গিয়ে শুধু দৃশ্য উপভোগ করেন না। স্থানীয় খাবার, স্মারক, হস্তশিল্প ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাও খোঁজেন। সেই দিক থেকে এ স্টলগুলো কার্নিভালের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
৮০০ পুলিশে নিরাপত্তা, চারটি মেডিকেল টিম
বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগমের সম্ভাবনা বিবেচনায় কার্নিভালের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তায় ৮০০ পুলিশ সদস্য, আটটি চেকপয়েন্ট, চারটি পার্কিং জোন, ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক, শতাধিক বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট সদস্য এবং চারটি মেডিকেল টিম রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা, যানজট নিরসন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. সামীমুজ্জামান বলেন, পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে সরকার প্রতি বছরই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের আয়োজন করে থাকে। এ বছর আমরা সেই আয়োজনটি পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় করেছি। আমরা চাই, এই কার্নিভালের মাধ্যমে কুয়াকাটায় থাকা বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্থান দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে। আমরা মনে করি, এই কার্নিভাল উপলক্ষে কুয়াকাটার পর্যটনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে সামনে আনতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে নতুন পর্যটন আকর্ষণগুলো পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহও বাড়তে পারে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার চেষ্টা করছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করতে। সে লক্ষ্যেই আমরা এই কার্নিভালকে গুরুত্ব দিচ্ছি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ পর্যটকের আগমনকে সফল করতে চাই। পাশাপাশি কুয়াকাটায় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও এই পর্যটন কার্নিভাল একটি বড় প্রচারমাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, কার্নিভালের মাধ্যমে কুয়াকাটার পর্যটন খাতের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে।
এফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
