‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’— এই ঘোষণা কে, কার নির্দেশে করেছিলেন? সে বিষয়ে পুলিশ এখনও কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি। চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর জন্য কতটা দায়ী সেই ঘোষণা— তা-ও এখনও স্পষ্ট নয়। এ বার সেই ঘোষণা রহস্যের জট কাটাতে ধৃত দুই ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু এবং কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করতে চাইছে পুলিশ। প্রয়োজনে তাঁদের কণ্ঠস্বরের নমুনাও সংগ্রহ করা হতে পারে।
চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোয় বিপর্যয়ের বেশ কিছু ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে (যার সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। তার মধ্যে দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যে তোলা ভিডিয়োয় শোনা যায় ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ার’ ওই ঘোষণা। সূত্রের খবর, ওই ঘোষণার সঙ্গে জড়িত সন্দেহেই সেন্টু এবং কুশলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ভাবে কে ওই ঘোষণা করেছিলেন, কে সেই নির্দেশ দিয়েছিলেন— সে বিষয়ে পুলিশ এখনও কিছু জানায়নি। এক দিকে যখন এই জট কাটাতে ব্যস্ত তদন্তকারীরা, তখন শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশের উদ্যোগেই নিমতলা ঘাটে নিরঞ্জন হল চোরবাগানের প্রতিমার। গোটা পর্বে উদ্যোক্তাদের কারও দেখা মেলেনি এ দিন।
বিপর্যয়ের পর থেকে এখনও পর্যন্ত ন’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ গ্রেফতারি সেন্টু এবং কালিয়ার। সেন্টুকে আগেই নিজেদের হেফাজতে পেয়েছে পুলিশ। শনিবার ব্যাঙ্কশাল আদালত কালিয়ারও ৬ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়। ধৃত দুই ঘোষকই বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে। বিপর্যয়ের সন্ধ্যার বেশ কিছু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ইতিমধ্যে খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। তবে সেই সময়ের ঘটনাক্রমের বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পেতে চাইছেন তাঁরা।
সিসি ক্যামেরায় যখন হুড়োহুড়ি শুরু হতে দেখা যায়, তখন পুজো কমিটির তরফে কী ঘোষণা করা হচ্ছিল— সে বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন সময়ে কী পরিস্থিতি ছিল এবং তখন কী ঘোষণা করা হচ্ছিল, তা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণাটি হুড়োহুড়ি শুরুর আগে, না পরে করা হয়েছিল, তা-ও খতিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের একটি সূত্রে খবর, চোরবাগানের পুজোয় ঘোষণার মূল দায়িত্ব ছিল সেন্টুর উপরেই। তা-ই ওই সন্ধ্যার ঘটনাক্রমের বিষয়ে আরও স্পষ্ট হতে সেন্টু এবং কালিয়াকে মুখোমুখি বসাতে চান তদন্তকারীরা।
পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনে ধৃত দুই ঘোষকের কণ্ঠস্বরের নমুনাও সংগ্রহ করা হতে পারে। উল্লেখ্য, ঘোষণার সঙ্গে গলার স্বর নিশ্চিত করার একটি পথ হল সংশ্লিষ্টের কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষা। উল্লেখ্য, তদন্তের স্বার্থে কারও কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতি নিতে হয়। পুলিশের এক আধিকারিক এ বিষয়ে জানান, গলার স্বর মেলানোর জন্য কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ ক্ষেত্রে তদন্ত এগোলে তা আরও পরিষ্কার হবে।
চোরবাগান কাণ্ডের তদন্ত করছে দু’টি দল। একটি কলকাতা পুলিশ। পাশাপাশি গোটা ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে একটি সিট গঠন করেছে রাজ্য। ইতিমধ্যে চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। তখনই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, প্রতিমা নিরঞ্জন করা হলেও তদন্তের জন্য মণ্ডপ রেখে দেওয়া হবে। পরে শুক্রবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দও জানান, প্রতিমা নিরঞ্জনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
চোরবাগানের প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিরঞ্জনের জন্য। শনিবার বিকেলে। — নিজস্ব চিত্র।
প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বার করে আনার জন্য শুক্রবারই মণ্ডপের গেটের কিছু অংশ কাটা হয়েছিল। শনিবার দুপুরে নিরঞ্জনের জন্য মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বার করে আনার তোড়জোড় শুরু হয়। প্রতিমা নিরঞ্জন যাতে সুষ্ঠু ভাবে হয়, তার জন্য পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে নিরঞ্জন পর্ব শুরুর আগে মণ্ডপ থেকে গঙ্গার ঘাটে কী ভাবে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পুজো উদ্যোক্তা বা কমিটির কাউকেই সেখানে দেখা যায়নি। পুলিশই সব ব্যবস্থা করে। সিমলা ব্যায়াম সমিতি পুজোর এক কর্মকর্তাকেও নিয়ে আসে তারা। তার পর প্রতিমা গঙ্গার ঘাটে নিরঞ্জনের জন্য নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৩৬ জন মিলে প্রতিমা বার করে আনেন রাস্তায়। প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার জন্য লরি নিয়ে আসা হয়েছিল। দড়ি বেঁধে, বাঁশ দিয়ে প্রতিমা লরিতে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। শেষে লোহার কার্টে চাপিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে পুলিশি পাহারায় নিমতলা ঘাটে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই নিরঞ্জন হয়।
শনিবার বিকেলে নিমতলা ঘাটে নিরঞ্জন হয় চোরবাগানের দেবীপ্রতিমা। — নিজস্ব চিত্র।
