চিলাহাটি-খুলনা রুটে যাত্রীদের নিত্য দুর্ভোগ
১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ ভারতে শিয়ালদাহ থেকে যশোর হয়ে রূপসা পাড়ের খুলনায় যখন প্রথম হুইসেল বাজিয়ে রেল সচল হয়েছিল, তখন অঞ্চলের মানুষের মনে আশা জেগেছিল যোগাযোগের এক নতুন ও আধুনিক যুগের।
১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ ভারতে শিয়ালদাহ থেকে যশোর হয়ে রূপসা পাড়ের খুলনায় যখন প্রথম হুইসেল বাজিয়ে রেল সচল হয়েছিল, তখন অঞ্চলের মানুষের মনে আশা জেগেছিল যোগাযোগের এক নতুন ও আধুনিক যুগের। এর পর গড়িয়ে গেছে শতবর্ষের বেশি সময়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অবসান ঘটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের, তৈরি হয় পূর্ব পাকিস্তান। অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পেরিয়ে এখন ২০২৬ সাল; পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ১৪২টি বছর। দেশ বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু উত্তরবঙ্গের সাথে খুলনা অঞ্চলের প্রধান এই লোকোমোটিভ যোগাযোগের কাক্সিক্ষত গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি আজও। খুলনা থেকে উত্তরবঙ্গের নীলফামারী জেলার চিলাহাটি পর্যন্ত ৪৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ অতিক্রমে যেখানে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা সময় লাগার কথা, সেখানে যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ব্যয় করতে হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা! আধুনিকায়নের যুগে এসেও একটি মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের প্রযুক্তির ইঞ্জিনের কারণে প্রতিদিন ট্রেনের টিকিটে লেখা নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত ৩ ঘণ্টা সময় গিলে খাচ্ছে রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা। খুলনা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যকার হাজার হাজার যাত্রীর কাছে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রুটের ভ্রমণ হয়ে উঠেছে ক্লান্তিকর ও চরম ভোগান্তির।
ঐতিহাসিক পথকথা ও চিলাহাটি-খুলনা রুটের গুরুত্ব
ব্রিটিশ আমলে ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতা এবং পূর্ব বাংলা ও উত্তরবঙ্গের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই রেল লাইন। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সীমান্ত পেরিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগ বিস্তৃত করতে খুলনা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং খুলনা-পার্বতীপুর রুটের উদ্ভাবন ঘটে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই যোগাযোগকে আরও প্রাণবন্ত ও নিরবচ্ছিন্ন করতে খুলনা থেকে সোজা উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারীর চিলাহাটি পর্যন্ত নিয়মিত দু’টি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়Ñযার একটি ‘রূপসা এক্সপ্রেস’ এবং অপরটি ‘সীমান্ত এক্সপ্রেস’।
প্রতিনিয়ত এই দুটি ট্রেনকে একটি দীর্ঘ ভৌগোলিক পথ অতিক্রম করতে হয়। চিলাহাটি থেকে যাত্রা শুরু করে ডোমার, নীলফামারী, সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, জয়পুরহাট, আক্কেলপুর, সান্তাহার, নাটোর, ঈশ্বরদী, ভেড়ামারা, পোড়াদহ, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, দর্শনা, কোটচাঁদপুর, যশোর, নওয়াপাড়া ও দৌলতপুর স্টেশন হয়ে অবশেষে খুলনায় পৌঁছায় ট্রেন দু’টি।
যাত্রী সুবিধার কথা চিন্তা করলে এই রুটের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় ৮৯৪টি করে আসন রয়েছে। প্রতিদিন খুলনা ও চিলাহাটি আসা-যাওয়া মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটিতে ৩ হাজারের বেশি যাত্রী খুলনা স্টেশন ব্যবহার করেন। এদের মধ্যে থাকেন দূর-দূরান্তের রোগী, পরীক্ষার্থী, সাধারণ ব্যবসায়ী ও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী। কিন্তু সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় নিয়মিত এই ৩ হাজার যাত্রীকে পড়তে হচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
শিডিউল বিপর্যয়ের নিত্য চিত্র
রেলওয়ের নিজস্ব সময়সূচি অনুযায়ী, “রূপসা এক্সপ্রেস” প্রতিদিন সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে চিলাহাটি থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে খুলনায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে গতকাল, পরশুসহ মাসের প্রায় প্রতিটি দিনই দেখা যাচ্ছে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩ ঘণ্টা পর অর্থাৎ রাত সাড়ে ৯টা বা তারও পরে গিয়ে খুলনা স্টেশনে পৌঁছায়।
একই চিত্র রাতের আন্তঃনগর “সীমান্ত এক্সপ্রেস”-এর ক্ষেত্রেও। এটি সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে চিলাহাটি ছেড়ে ভোররাত ৪টা ২০ মিনিটে খুলনা পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিদিন ভোররাত পেরিয়ে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা বেজে যায়।
ফিরতি যাত্রাতেও দুর্ভোগের কোনো কমতি নেই। খুলনা স্টেশন থেকে রূপসা এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে এবং সীমান্ত এক্সপ্রেস রাত ৯টা ১৫ মিনিটে চিলাহাটির উদ্দেশ্যে ছাড়ে। কিন্তু ইঞ্জিনের ধীরগতি ও রুটের নানা জটিলতায় গন্তব্যে পৌঁছাতে এই ট্রেন দুটির নিয়মিত ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা দেরি হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বয়ান ও ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স ঘাটতি
প্রতিদিনের এই ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয় ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে খুলনা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার মো. জাকির হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এই রুটের দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে নিয়মিত ব্যবহৃত ইঞ্জিনগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে এগুলোর কাক্সিক্ষত গতি উঠে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের স্বাভাবিক গতি অনেক কম থাকে, যার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনোভাবেই পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এছাড়া বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন ক্রসিং, যাত্রী ওঠা-নামায় বাড়তি সময় লেগে যায়। শীতের সময় ঘন কুয়াশার কারণেও ট্রেনের গতি আরও কমাতে হয়, যার প্রভাবে পুরো শিডিউল ভেঙে পড়ে।” জানা গেছে, খুলনা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন রুটে মোট ১১ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও মূলত ইঞ্জিনের অভাবেই সবকটি ট্রেনের শিডিউল সঠিকভাবে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
একই সুর ধ্বনিত হয়েছে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন মহলেও। রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোক) মো. বোরহান উদ্দিন স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমান শিডিউল বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান কারণ পর্যাপ্ত বগির অভাব এবং লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের চরম মেয়াদহীনতা। তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো যদি শতভাগ সচল থাকত, তবে আজ সাধারণ যাত্রীদের এই শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না।
দক্ষিণ কোরিয়ার “হুন্দাই” চুক্তি ও বড় ধরনের অনিয়ম
রেলওয়ের ইঞ্জিনের বর্তমান এই সংকটের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে একটি বড় ধরনের অনিয়ম ও তঞ্চকতার ইতিহাস। যাত্রী সেবার মান বাড়াতে ও বাংলাদেশ রেলওয়েকে গতিশীল করতে ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সাথে চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি নতুন লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনা হয়।
২০২০ সালে চুক্তি অনুযায়ী সেই ৩০টি ইঞ্জিন বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়। কথা ছিল ইঞ্জিনগুলোর মেয়াদ ও কার্যকারিতা অন্তত ২০ বছর নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেবে। কিন্তু সরবরাহ করার কিছুদিন যেতে না যেতেই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
চুক্তিপত্রের স্পষ্ট শর্ত ছিল, হুন্দাই রোটেম কোম্পানি ১২ সিলিন্ডারের ৭১০ সিরিজের ভারী ইঞ্জিন সরবরাহ করবে। কিন্তু তারা চুক্তির স্পষ্ট বরখেলাপ করে সরবরাহ করে তুলনামূলক দুর্বল ৮ সিলিন্ডারের ইঞ্জিন। শর্তবহির্ভূত এবং কারিগরিভাবে দুর্বল এই ইঞ্জিনগুলো ব্যবহারের কিছুদিনের মধ্যেই অচল হতে শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০ বছর সচল থাকার কথা থাকলেও, সরবরাহ করা ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২০২৩ সালের আগস্টের মধ্যেই ২৩টি ইঞ্জিন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে রেলওয়ের চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এ ধরণের গুরুতর তঞ্চকতা ও শর্তলঙ্ঘনের সাথে দেশি ও বিদেশি এক প্রভাবশালী চক্র প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বিষয়টি পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আসে এবং কমিশন এটি আমল নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানে নামে।
স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
১৪২ বছরের দীর্ঘ পথচলায় বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে আধুনিক ডিজেল কিংবা ইলেকট্রিক ট্রেনের যুগে বিশ্ব প্রবেশ করলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম দীর্ঘ এই রুটে যাত্রীদের এখনও খেসারত দিতে হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও কেনাকাটার দুর্নীতির। ৪৪৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ১৪ ঘণ্টা সময় পার হয়ে যাওয়া কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতিকেও মন্থর করে দিচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার যাত্রীর দাবিÑশুধু আশ্বাস নয়, দ্রুতগতির ও মানসম্মত নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ করে চিলাহাটি-খুলনা রুটের “রূপসা” ও “সীমান্ত” এক্সপ্রেসকে শিডিউল বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা হোক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার অবসান ঘটিয়ে রেল সেবা মানুষের দোড়গোড়ায় সত্যিকারের স্বস্তি হিসেবে পৌঁছে দেওয়া হোক।
