Published on
:
4 min read
লিখছেন মৃন্ময় চন্দ
ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক, সোডিয়াম-পটাশিয়াম-ক্যালসিয়াম তড়িতাধানের মাধ্যমে পরিবাহিত হয় স্নায়ুস্পন্দন। চোখের পলকে মস্তিষ্কের নির্দেশ পৌঁছে যায় বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। দুস্তর পথ, স্নায়বিক উদ্দীপনাকে পাড়ি দিতে হয় কর্ম-সম্পাদনে। পথে পড়ে ৫০০ ট্রিলিয়ন সাইন্যাপস। দুটো নিউরন বা নার্ভকোষের সংযোগস্থলকে বলে সাইন্যাপস। এককোষী জলজ সবুজ শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস বা ‘ক্ল্যামি’, চ্যানেলরোডপসিন-টু (সিএইচআর২) প্রোটিনটির সাঙ্কেতিক ইশারায় নিশির ডাকের মতো ছোটে আলো ধরতে। আলোর দিকে, ক্ল্যামাইডোমোনাস-এর দৌড়ের মূলে রয়েছে ‘চ্যানেল রোডোপসিন-টু’ প্রোটিনটির আলোকতড়িৎ সংবেদনশীলতা। কার্ল ডেইসেরথ-এর সঙ্গে, সিএইচআর২ প্রোটিনটির ‘ফটোট্যাক্সিস’ চলনকে হাতেনাতে পাকড়াও করেছিলেন জর্জ নাগেল, আর্নস্ট ব্যামবার্গ এবং পিটার হেগেম্যান। সিএইচআর২ আবিষ্কারের সুবাদে, এ বছর ফিজিওলজি-মেডিসিন-এর নোবেল পুরস্কার ঝুলিতে ভরলেন কার্ল ডেইসেরথ, জর্জ নাগেল এবং পিটার হেগেম্যান।
সাল ২০০৫। সিএইচআর২ প্রোটিনটির কার্যকারিতা অনুধাবনের পর এড বয়ডেন, ফেন ঝাং এবং কার্ল ডেইসরথ কোমরবেঁধে নামলেন সিএইচআর২ প্রোটিনটিকে মানবশরীরের কোনও কাজে লাগানো যায় কিনা, তার সুলুকসন্ধানে। নাগেল এবং ব্যামবার্গ জুড়ে গেলেন অন্য তিন সতীর্থ, বয়ডেন-ঝাং-ডেইসরথ-এর সঙ্গে। তাঁরা সম্মিলিত ভাবে দেখলেন এবং দেখালেন, সিএইচআর২-র আলোক-উৎসারিত পথ স্নায়ুকোষকে জাগিয়ে বা ঘুম পাড়িয়ে স্নায়ুতন্ত্রের নানা জটিল ব্যাধি নিরাময়ের পথ দেখাচ্ছে। বহুকোষী উন্নত মানবশরীরে, এককোষী আণুবীক্ষণিক শৈবাল ‘ক্ল্যামি’র সিএইচআর২ প্রোটিন এক আগন্তুক। সেই আগন্তুক নিউরন-এর মধ্যে ঢুকে শতপুষ্পে বিকশিত হচ্ছে, সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে প্লাজ়মা মেমব্রেনে। বহির্জগতের বিজাতীয় কোনও বস্তু মানবশরীরে প্রবেশ করলেই গোলমাল বেঁধে যায়। আদ্যন্ত অপরিচিত একটা প্রোটিন নির্বিবাদে মানবশরীরে প্রবেশ করল, শরীর তাকে বরণডালা সাজিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে বিরলতম ঘটনা বলেই পরিগণিত এটি। সিএইচআর২ প্রোটিনটির সাহায্যে স্নায়ুকোষকে উদ্দীপ্ত করিয়ে বিভিন্ন স্নায়বিক কর্ম-সম্পাদনের পদ্ধতিটি বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ নামে পরিচিত।
অপ্টোজেনেটিক্স-এর ইতিবৃত্ত
নিউরন বা স্নায়ুকোষের মধ্যে সিএইচআর২-কে প্রবেশ করিয়ে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের চেষ্টা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ এবং অভূতপূর্ব প্রয়াস। তবে ২০০৫ সালের আগেও সিএইচআর২-কে নিয়ে নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে। মিসেনবাক ল্যাব, ইউনিভার্সিটি অফ বার্কলে-র ট্রনার বা ক্র্যামার ল্যাবে ২০০০ সাল থেকেই ‘অপটোজেনেটিক্স’ সংক্রান্ত নানা ঈর্ষণীয় গবেষণা চলছিল। ডেইসরথ, নাগেল, হেগেম্যান ও ব্যামবার্গদের তাই ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর পথিকৃৎ বলা সমীচীন নয়। আলো কী ভাবে নিউরন বা স্নায়ুকোষকে উদ্দীপ্ত করছে, ট্রনার বা ক্র্যামাররা সে বিষয়ের পাঠোদ্ধারে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। আর একটু পিছনে ফিরে তাকালে, ১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর রয়্যাল সোসাইটির জার্নালে, ফ্রান্সিস ক্রিক-এর ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অফ মলিকিউলার বায়োলজি অন নিউরোসায়েন্স’ নামে একটি অনবদ্য গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ক্রিক বলেন যে অণুজীববিদ্যা, নিউরোলজির বহু বন্ধ দরজার তালা খুলে দিতে পারে। কী ভাবে? ক্রিক বললেন, স্নায়ুকোষের উদ্দীপনা পরিবহণকে নিখুঁত পারম্পর্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আলো। সোজা কথায়, স্নায়ুকোষের নানাবিধ বাঁদরামিকে শুধরোতে পারে আলো। তত দিনে ‘হিউম্যান জিনোম সায়েন্স’-এর নানা অপ্রত্যাশিত ফল সামনে আসতে শুরু করেছে। ২০০৪ সালে, ক্রিক-এর মৃত্যুর পর, ‘অপটোজেনেটিক্স’এর অসমাপ্ত রিলে-রেসের বাটনটা নাগেল-ডেইসরথ-হেগেম্যান-ব্যামবার্গদের হাতে এসে পৌঁছল। এক ঢিলে দুই পাখি মারছিল সিএইচআর২। জিন এবং প্রোটিন সিএইচআর২, কোনও রকম পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া প্লাজ়মা মেমব্রেন, অ্যাকশন-ডেনড্রন-সাইন্যাপস-এর বেড়াজাল টপকে সরাসরি স্নায়ুকোষে পৌঁছে নির্বিবাদে উদ্দিষ্ট কাজ সারছিল। কোনও রকম ট্যাঁ-ফোঁ করার সুযোগ না দিয়ে, মানবশরীরের ওপর সিএইচআর২ জিন ও প্রোটিনের যুগপৎ খবরদারি, চিকিৎসা-বিজ্ঞানে ব্যতিক্রমী ঘটনা বলেই বিবেচিত।
দিগন্তবিস্তারী হতাশা
সাল ২০০৫। এক-বুক আশা নিয়ে, দিনরাত এক করে, নাগেল-ডেইসরথ-ব্যামবার্গ-হেগেম্যানরা তাঁদের গবেষণা-সন্দর্ভটি পাঠালেন ‘নেচার’ এবং ‘সায়েন্স’ পত্রিকায়। ‘নেচার’ এবং ‘সায়েন্স’ নানা অজুহাতে গবেষণাপত্রটি বাতিল করে দিলো। ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ঠিক থাকলেও, ব্যবহারবিধি বা প্রায়োগিক প্রকৌশল সম্বন্ধে নানা ওজর আপত্তি তুলল ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’। জরুরি কিছু পরিমার্জনের পর পুনরায় গবেষণাপত্রটি পাঠানোর সুপারিশ করল। একজন রেফারি লিখলেন, ‘গাঁজাখুরি গল্প শুনতে ভালো, কিন্তু আমার চোখে সিএইচআর২-র নেই কোনও ব্যবহারিক উপযোগিতা’। গোঁফে তা দিয়ে আরও দু’জন রেফারি বললেন, ‘বৃহত্তর মানবকল্যাণে এ সব পাতা-ভরানো হাঁসজারু গবেষণার কোনও ভূমিকা নেই’। ‘নেচার’ বা ‘সায়েন্স’ বিরূপ মনোভাবের আঁচ পেয়ে ২০২৬-এর নোবেল প্রাইজ় পাওয়া গবেষণাপত্রটিকে অগত্যা খারিজ করে দিলো। বেশির ভাগ যুগান্তকারী আবিষ্কার সমকালের দর্পণে বিশেষ পাত্তা পায় না। বিবর্জিত হয় আস্তাকুঁড়ে। তথাপি গবেষণার চরৈবেতি চলতেই থাকে। কণ্টকাকীর্ণ সেই অদৃশ্য পথের বীণা শোনে শুধু অনন্ত সময়। কালের নিয়মে, ২০০৫-এর বিফল-মনোরথ গবেষকদের গবেষণাও নিঃশব্দে এগোতে থাকল। ২০০৫-এর পাপ-স্খালনে. ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর দশম বর্ষ উদযাপনে, ২০১৫ সালে, ‘নেচার’ গোটা পত্রিকাটিকেই উৎসর্গ করলো ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর পাদপদ্মে। ডিগবাজি খেয়ে সেপ্টেম্বর ২০১৫-র ‘নেচার’ সম্পাদকীয়তে লেখা হলো, আগামী ১০ বছরে ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল, ভাস্বর এবং অভিনব হতে চলেছে পাঠক মাত্রই তা বুঝতে পারবেন।
নোবেলের যথার্থতা
১৯০১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত, ফিজ়িওলজি-মেডিসিনে ২৩৫ জন নোবেল বিজেতার ১৪ জন মাত্র মহিলা। মেডিসিনে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল প্রাপকের বয়স ৩১ বছর এবং সর্বোচ্চ নোবেলজয়ীর বয়স ৮৭ বছর। ‘নেচার’ বলছে, নোবেলের জন্য, ১৯৬০-এর আগে গবেষক-বিজ্ঞানীদের হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হতো ১৪ বছর। ২০১০ থেকে নোবেলের প্রহর গোনার পালা ১৪ থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৯ বছর। ৬৫ শতাংশ মেডিসিনের নোবেল এ যাবৎ ভাগ হয়েছে দুই অথবা তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে। ‘নেচার’-এর মতে, নোবেল পাওয়ার সহজ রাস্তা নাকি উত্তর আমেরিকায় জন্মানো নতুবা কর্মসূত্রে উত্তর আমেরিকায় কাটানো। নামের আদ্যক্ষর ‘জে’ বা ‘এ’ হলেও নাকি নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে। যা-ই হোক, স্নায়ুবিজ্ঞান বা মস্তিষ্কের কাটাছেঁড়ায় এ বছর নোবেল মিলল না, মিলল পুকুরে সাঁতরে বেড়ানো এককোষী সবুজ শৈবালের পিছনে ধাওয়া করেই। ‘ক্ল্যামি’র ডিএনএ থেকে কৃত্রিম ভাবে সংশ্লেষিত সিএইচআর২ প্রোটিনটি মানুষ এবং হ্যামস্টারের ভ্রূণাবস্থার কিডনি কোষে প্রবেশ করিয়ে নাগেল এবং হেগেম্যান সিএইচআর২-র আলোক সংবেদিতার হদিশ পেয়েছিলেন। দু’জনেই তাঁরা তখন জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটে-এ গবেষণারত। সে সময় ডেইসরথ এবং তাঁর কিছু সহকারী দেখলেন বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আরও বেশ কিছু নিদ্রাতুর স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করতে সক্ষম। ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর পূর্ণতা প্রাপ্তির মাহেন্দ্রক্ষণ সেটাই। ডেইসরথরা ইঁদুরের মস্তিষ্ককে ফুটো করে সিএইচআর২ জিনটিকে ইঁদুরের মোটর নিউরনে প্রবেশ করালেন। সূক্ষ্ম অপটিকাল ফাইবারের মধ্যে দিয়ে আলো প্রবেশ করিয়ে তাঁরা নিজেদের মর্জিমাফিক ইঁদুরের গোঁফের নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। ইঁদুরদের ঘুম পাড়ানো এবং জাগিয়ে তোলার কারিকুরিও তাঁরা রপ্ত করে ফেললেন। মানুষের মতোই, কোনও কিছুতে ভয় পেলে, সেই ভয়ের স্মৃতি ইঁদুরদের মস্তিষ্কে প্রোথিত থাকে। আলো এবং সিএইচআর২-র যুগলবন্দির আয়ুধে সফল ভাবে তাঁরা ইঁদুর-মস্তিষ্ক থেকে ভয়ের অনপনেয় স্মৃতিকে মুছে দিতে সমর্থ হলেন। ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর ইউরেকা মুহূর্তে উপনীত হয়ে তাঁরা মস্তিষ্কের বিভিন্ন আলোকসংবেদী অংশকে চিহ্নিত করতে শুরু করলেন। ব্যথা-যন্ত্রণা-স্নেহ-বিরাগের রসায়ন স্পষ্ট হয়ে তাঁদের কাছে ধরা দিতে লাগল। ঘুমের জৈবঘড়ির রহস্যও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকল। নেশাসক্তি-ডিমেনশিয়া ইত্যাদিকে ঝেঁটিয়ে বিদায়ের রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেল। মন আর মস্তিষ্কের পৃথক অস্তিত্ব নেই, দু’টিই যে একে অপরের পরিপূরক, জানা গেল তাও। রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায়, মানুষের চোখের ‘রড ও কোন’ সেলের মৃত্যুতে ঘনায় অকাল-অন্ধত্ব। বর্তমানে ‘অপটোজেনেটিক্স’-এর কল্যাণে অন্ধত্বকে কিছুটা দূর করা যাচ্ছে, দূর করা যাচ্ছে ককলিয়ার ত্রুটি-জনিত বধিরতাকে।
টেক্সাস-এর, ডালাস-এর, ‘ন্যানোস্কেপ থেরাপিউটিক্স’ অপটোজেনেটিক্স-এর সহায়তায় রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা দমনের অস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে। অপেক্ষা এফডিএ-র অনুমোদনের। অপটোজেনেটিক্স বিষয়টি এতটাই সহজ, অনাড়ম্বর এবং মানবজীবনে অমোঘ যে, নোবেল ছাড়া তার অনস্বীকার্য ভূমিকা স্বীকার অসম্ভব। যদিও গ্লিয়াল সেল বা স্টেম সেল-এর আবিষ্কার নোবেল-বঞ্চিত, আভেরি ওসওয়াল্ড বা ব্রেন্ডা মিলনারের মতো প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানীরাও বঞ্চিত নোবেল পুরস্কারে। বিশ্ববিশ্রুত স্নায়ুবিজ্ঞানী, ৯৪ বছর বয়সি ব্রেন্ডা মিলনার এখনও ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে কাজ করে চলেছেন। নোবেল প্রাইজ়-এর রোশনাই তাঁদের মতো পথিকৃৎদের আলোকিত করবে কি এর পর?
লেখক জিন বিশেষজ্ঞ
