ভালো কথা বলতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন কথা বলা বোঝায়, যা শুনে সে প্রশান্তি ও আনন্দ লাভ করে এবং যার মাধ্যমে তার অন্তরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
যে কথা সমাজে সুফল বয়ে আনে, অশান্তি দূর করে এবং কল্যাণের পথ প্রশস্ত ও অকল্যাণের পথ রুদ্ধ করে, সেটাই ভালো কথা।
ইসলামে ভালো কথাকে ‘কালিমাতুত তাইয়্যিবাহ’ বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ ভালো কথা বা সুন্দর কথা বলার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আর মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৩)
ভালো কথার জাদুকরি সুফল
সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে এবং একটি সুখ–সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে পারস্পরিক ভালো কথা ও মধুর ভাষা প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
তাই কোরআন ও হাদিসে বিভিন্নভাবে ভালো কথার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে পরকালীন সওয়াবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
১. দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ: ভালো কথার সুফল সমাজজীবনে ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি। মহান আল্লাহ একটি উপমা দিয়ে বলেছেন, ‘ভালো কথার দৃষ্টান্ত হলো ভালো গাছ, যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত, যা তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সর্বদা ফল দিয়ে থাকে।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২৪-২৫)
এই রূপকের মাধ্যমে ভালো কথার দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের দিকটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫২২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)
২. ভালোবাসা বৃদ্ধি: ভালো কথা বা মধুর ভাষা মানুষকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করে। চরম শত্রুকেও অনুপম ভাষাশৈলী ও আচরণের মাধ্যমে পরম বন্ধুতে পরিণত করা সম্ভব।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো তা দ্বারা যা উত্তম। ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)
৩. সদকার সওয়াব: ইসলামে ভালো কথার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মহানবী (সা.) প্রতিটি ভালো কথাকে সদকা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, ‘ভালো কথা বলা সদকা এবং নামাজের দিকে ধাবিত প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৭৪৭০)
দান–সদকা দোজখের আগুন নিভিয়ে দেয়। যাদের দান করার সামর্থ্য নেই, তাঁদের জন্য ভালো কথাকে দানের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘খেজুরদানার একটি টুকরো দিয়ে হলেও তোমরা দোজখের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করো। যদি তা–ও না পারো, তবে ভালো কথা দ্বারা রক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪১৭)
আরও বলেছেন, ‘তুমি ভালো কাজের কোনোটিকেই তুচ্ছ জ্ঞান করো না। তুমি যদি কোনো ভালো কাজ না পাও, তবে মানুষের সঙ্গে নরম ভাষায় কথা বলো, সে সময় তোমার চেহারা থাকবে প্রসন্ন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৯৮)
৪. বেহেশত লাভের মাধ্যম: মধুর ভাষা বেহেশত পাওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং মধুর ভাষা ব্যবহার করা বেহেশত লাভ নিশ্চিত করে।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৪/৫৮, দারুল হারামাইন, কায়রো, ১৯৯৫)
জনৈক সাহাবি রাসুল (সা.)-কে এমন একটি আমলের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, তোমার কর্তব্য হলো উত্তম কথা বলা এবং খাবার দান করা।
৫. মন জয়ের হাতিয়ার: কঠোর ভাষা দিয়ে কখনো মানুষের মন জয় করা যায় না। মহানবী (সা.) যদি মিষ্টভাষী না হতেন, তবে তাঁর মিশনে সফল হতে পারতেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমতে আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি কর্কশভাষী ও কঠিন দিলের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
৬. মনে প্রশান্তির পরশ বোলানো: কেউ কোনো প্রয়োজনে কারও কাছে এলে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব না হলেও তার সঙ্গে ভালো ও নম্র কথা বলা উচিত; এতে সে মনে প্রশান্তি লাভ করে।
আলী (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা মানুষকে অর্থ দিয়ে তুষ্ট করতে পারবে না, বরং চরিত্র দিয়ে তুষ্ট করো। সুতরাং সব মানুষের সঙ্গেই ভালো কথা বলতে হবে ও নম্র আচরণ করতে হবে।’ (আলী ইবন আবি তালিব, নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ৪১২, দারুল মরতাদা, বৈরুত, ২০০২)
শেষ কথা
ফেরাউনের মতো জালেমের কাছে পাঠানোর সময়ও আল্লাহ–তাআলা নবী মুসা ও হারুন (আ.)–কে নরম ভাষা প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভয় পাবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪)
যে ধরনের কথাবার্তায় মানুষ কষ্ট পায়, তা ভালো কথা নয়। যারা মানুষের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, কথায় কথায় অভিসম্পাত করে এবং অশ্লীল ও নির্লজ্জ কথাবার্তা বলে, তারা প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭০)
সাকী মাহবুব: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, রাজবাড়ী
