পাবনা মানসিক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নিজ দায়িত্ব পালন না করে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নিজ ক্লিনিকে ভর্তি করার অভিযোগ উঠেছে।
নিজের পেশার যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালে নামে ক্লিনিক। রোগী ভাগিয়ে নিজ ক্লিনিকে ভর্তি করাই যেন তার মূল পেশা। হয়েছেন কোটি টাকার মালিক। এ ছাড়া নানা অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে এ হাসপাতালের কার্যক্রম। একইকক্ষে গাদাগাদি করে রোগী রাখা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নার্স না থাকা, একই হাসপাতালে মানসিক রোগী ও মাদকসেবী রোগীদের চিকিৎসা, মধ্য শহরের মধ্যে চাপা সড়কে গাড়ি পার্কিং জায়গা না থাকাসহ নানা অভিযোগ।
প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহনাজ সুলতানা চম্পা হলেও, কাগজে কলমে মালিক করে রেখেছেন তার বড় ছেলে ইউসুফ বিন মিজানকে। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করার পরেও কোন নিয়মে হাসপাতাল চালাচ্ছেন তা নিয়ে চলছে সমালোচনার ঝড়।
সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায় নানা অনিয়ম। অফিসে ঢুকতেই প্রধান ফটকে চোখে পড়ে তালা দেওয়া। ডাকতেই বেরিয়ে আসেন হাসপাতালটির ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দেওয়া আকাশ হোসেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তালা খুলে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেন।
তার মাধ্যমে হাসপাতালটি সম্পর্কে জানা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি একটি ভবনের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলা ভাড়া নিয়ে চলছে। হাসপাতালের রোগীর ক্যাপাসিটি অনুমোদন রয়েছে ১৭ জনের। বর্তমানে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৮ জন।
ঘুরে দেখা যায়, একটি ওয়ার্ডের প্রতিটি শয্যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকার নিয়ম থাকলেও এক রুমে ৫টি বেড একসাথে লাগানো। সেখানেই গাদাগাদি করে থাকছে রোগীরা। যদিও মানসিক রোগী ও মাদক রোগী আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। পাশের ছোট্ট একটি কক্ষে চলে রোগীদের খাবার খাওয়া। পাশেই টয়লেট। এ সময় হাসপাতালটিতে অন্য কোনো নার্সের (পুরুষ বা মহিলা) দেখা মেলেনি। মধ্য শহরে জনবহুল এলাকায় হাসপাতালটির অবস্থান হওয়ায় গাড়ি পার্কিংয়ের নেই কোনো ব্যবস্থা।
ম্যানেজার আকাশ হোসেন জানান, হাসপাতালটিতে ঢাকা ও পাবনার তিনজন মানসিক ডাক্তার রোগী দেখেন। এর মধ্যে ঢাকা থেকে একজন ডাক্তার সপ্তাহে একদিন আসেন। পাবনার ডাক্তার যখন প্রয়োজন তখন এসে রোগী দেখেন। এ ছাড়া সবসময় জন্য কোনো ডাক্তার সেখানে থাকেন না।
শাহনাজ সুলতানা চম্পা ১৯৯৮ সালে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নার্স হিসেবে যোগদান করলেও এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। বদলিযোগ্য চাকরি হলেও তাকে এত বছরে একবারও কোথাও বদলি করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে আসেন নিজের ক্লিনিকে। মানসিক হাসপাতালের সরকারি ওষুধ কারচুপিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এসব অপকর্ম তিনি সিভিল সার্জন ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অফিসকে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, পৈতৃক বাড়ি ঈশ্বরদীতে হলেও পাবনা পৌর শহরের পাওয়ার হাউসপাড়া এলাকায় কোটি টাকা খরচে জায়গা কিনে বহুতল ভবন করেছেন শাহনাজ সুলতানা চম্পা। ছোট ছেলে ইউনুস বিন মিজান পূর্নকে অর্ধকোটি টাকা খরচে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছেন লেখাপাড়া করার জন্য।
এদিকে লাইসেন্সের কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। নবায়ন করা হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। আর নবায়ন করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করা হয়নি। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সের মেয়াদ আছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।
সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে মানসিক হাসপাতাল থেকে নিজের বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ছুটে আসেন শাহনাজ সুলতানা চম্পা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার সময় বড় ছেলেটা বিপথে চলে যাবে ভেবে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে এই হাসপাতালটি করে দিয়েছি। তার নামেই সবকিছু, সেই মালিক। আমি মা হিসেবে তার পাশে রয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ‘ছোট ছেলে স্কলারশিপ পেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গেছে। আমার কাজিনরা আর্থিক সহযোগিতা করে তাকে পাঠিয়েছে। বাড়ির জায়গা কেনা ও বাড়ি করার ক্ষেত্রে আমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছি। আর শহরের মধ্যে ওই সময় নিজস্ব ভবন ছিল না, তাই ভবন ভাড়া নিয়ে হাসপাতালটি করা হয়েছে। কেউ হয়তো ষড়যন্ত্রমূলক শত্রুতাবশত আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।’
পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়া আছে। তাদের নবায়ন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া শহর থেকে বাইরে হাসপাতালটি স্থানান্তর করবে বলে আগামী দুই বছর সময় নিয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি মানসিক হাসপাতালসহ জেলায় সকল ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমরা নিয়মিত পরিদর্শন করি।’
পাবনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শহিদুল মান্নাফ কবির বলেন, ‘পাবনায় দুটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স রয়েছে। দুটিরই লাইসেন্স নবায়ন করা আছে। তবে এর আগেও অভিযোগ ওঠায় তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আবার যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে তাদের নজরদারির মধ্যে আনা হবে।’
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এসব হাসপাতালের লাইসেন্স দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আমরা শুধু তাদের দেখভাল করি। তারপরও বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখব। কোনো অনিয়ম পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
