একটা ফেরিঘাটে কত গল্প থাকতে পারে? কেউ নদী পার হওয়ার অপেক্ষায়, কেউ জীবিকার তাগিদে ছুটছেন, কেউ হয়তো প্রতিদিনের মতোই ঘাটের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের কাজটুকু করে যাচ্ছেন। কারও কাছে এই ঘাট গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ, কারও কাছে রোজগারের জায়গা, আবার কারও জীবনেরই একটা অংশ। প্রতিদিনের এই চেনা দৃশ্যগুলোকে একটু অন্যভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে ‘এক ঘাট, অনেক গল্প-ফেরিঘাটের জীবন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
গত ৮ অক্টোবর প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ফটোগ্রাফি কোর্স ১১তম আবর্তনের কোর্স সমাপনী এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ৫৯ জন শিক্ষানবিশ আলোকচিত্রী। উদ্বোধনের পর ৯ অক্টোবর থেকে প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় এই প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ১৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে গিয়ে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা আর গ্যালারিতে সেই ছবিগুলো একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই একরকম নয়। ঘাটে দাঁড়িয়ে হয়তো অনেক কিছুই চোখে পড়ে, আবার ব্যস্ততার মধ্যে অনেক কিছু চোখ এড়িয়েও যায়। কিন্তু ক্যামেরায় ধরা পড়া মুহূর্তগুলো যখন একসঙ্গে দেয়ালে সাজানো থাকে, তখন পরিচিত দৃশ্যগুলোকেও নতুন করে দেখতে ইচ্ছে করে। এই প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখতে দেখতে বারবার মনে হবে, একই জায়গায় দাঁড়িয়েও মানুষ কত ভিন্নভাবে চারপাশকে দেখতে পারে! কোনো ছবিতে নদী আর ফেরির বিশালতা, কোনো ছবিতে মানুষের ব্যস্ততা, আবার কোনো ছবিতে অপেক্ষারত মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কোথাও প্রকৃতি ছবির মূল বিষয়, কোথাও মানুষই ছবির প্রাণ। কিছু ছবিতে এমন সাধারণ মুহূর্ত ধরা পড়েছে, যেগুলোর দিকে হয়তো আমরা সচরাচর আলাদা করে তাকাই না। অথচ একটু থামলে বোঝা যায়, এই ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেও গল্প আছে।
ছবিগুলোর রঙের ব্যবহারেও একটা স্বাভাবিকতা রয়েছে। ধূসর আকাশ, নদীর নীলচে পানি, চারপাশের বাদামি ও সবুজ রং মিলে অনেক ছবিতে শান্ত একটা আবহ তৈরি করেছে। এর মধ্যে কোথাও রঙিন ছাতা, বেগুনি পোশাক, লাল চেয়ার কিংবা সূর্যাস্তের কমলা-লাল আকাশ আলাদা করে চোখে পড়ে। সব ছবি যে খুব উজ্জ্বল বা নাটকীয়, তা নয়। বরং কিছু ছবির সাধারণ রং আর নরম আলোই দৃশ্যগুলোকে আপন করে তুলেছে।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখার সময় একটা বিষয় ভালো লেগেছে, মনে হয়েছে সবাই একই জায়গায় ছবি তুললেও ছবিগুলো এক রকম হয়ে যায়নি। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে কিছু একটা খুঁজেছেন। কেউ হয়তো একটি দৃশ্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন, কেউ মানুষের কাজের মধ্যে গল্প খুঁজেছেন, আবার কেউ কোনো একটি মুহূর্তকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। আলোকচিত্রের এই দিকটাই আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয়। আমরা সবাই চারপাশে একই পৃথিবী দেখি, কিন্তু সবার চোখে সেই পৃথিবী একভাবে ধরা দেয় না।
ছবিগুলো একই ধরনের হালকা কাঠের ফ্রেমে সাদা পটভূমিতে সাজানো হয়েছে। এতে পুরো গ্যালারিতে সুন্দর একটা সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তবে ছবিগুলোর সাথে অল্প একটু বিবরণ থাকলে পড়তে সুবিধা হতো। আর ছবির সঙ্গে আলোকচিত্রীর নিজের দু-একটি কথা থাকলে ছবিগুলোকে আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হতো। ছবিটি তোলার সময় কী ঘটছিল, কেন সেই মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধরে রাখতে ইচ্ছে হলো এমন ছোট্ট গল্পও অনেক সময় একটি ছবিকে অন্যভাবে দেখতে শেখায়।
অবশ্য প্রদর্শনীর সব ছবিই যে সমানভাবে সফল হয়েছে, তা নয়। কিছু ছবিতে আলো নিয়ন্ত্রণ, স্পষ্টতা কিংবা ফ্রেমের ভেতরে বিষয় সাজানোর ক্ষেত্রে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কোথাও নদী ও ফেরির একই ধরনের দৃশ্য বারবার এসেছে বলেও মনে হয়েছে। তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে শেখার পথেরই অংশ হিসেবে দেখা যায়। কারণ, এটি পেশাদার আলোকচিত্রীদের প্রদর্শনী নয়; বরং আলোকচিত্র শেখার পথে থাকা ৫৯ জন মানুষের সম্মিলিত চর্চা। একটি ছবি ভালো হয়েছে কি না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোথায় আরও ভালো করা যেত, সেটি বুঝতে পারাও শেখার অংশ।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটের ছবিগুলোর আরেকটি দিক আছে। আজ যে দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে খুব পরিচিত, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে। বদলে যেতে পারে ফেরিঘাটের পরিবেশ, মানুষের কাজের ধরন, যানবাহন চলাচল কিংবা নদীপথের যোগাযোগব্যবস্থা। তখন আজকের তোলা ছবিগুলোই হয়তো অতীতের সেই সময়টাকে মনে করিয়ে দেবে। একটি ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা যানবাহন কিংবা নদীর বুকে চলতে থাকা ফেরি এসবই একসময় হয়ে উঠতে পারে সময়ের সাক্ষী। সে জন্য ছবিগুলো কোথায়, কখন ও কী পরিস্থিতিতে তোলা হয়েছে, সেই তথ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি।
তবে সবকিছুর বাইরে এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা হলো, এখানে একটি পরিচিত স্থানকে ৫৯ জন মানুষের চোখে দেখার সুযোগ রয়েছে। একই ঘাট, একই নদী, অথচ কত রকমের দেখার ভঙ্গি! কারও ছবিতে ব্যস্ততা, কারও ছবিতে অপেক্ষা, কারও ছবিতে প্রকৃতি, আবার কারও ছবিতে জীবনের খুব সাধারণ একটা মুহূর্ত। সব ছবির গল্প এক নয়, কিন্তু সব গল্পই যেন একই জায়গায় এসে মিলেছে।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটের পরিচিত দৃশ্যের পাশাপাশি মানুষের প্রতিদিনের জীবনের কথাও উঠে আসে। এই ঘাটে কেউ আসে, কেউ চলে যায়; কারও দিন শুরু হয়, কারও অপেক্ষা শেষ হয়। আর সেই চলাচলের মাঝখান থেকে আলোকচিত্রীরা ধরে রেখেছেন কিছু মুহূর্ত, যা হয়তো অন্য সময়ে, অন্য চোখে দেখলে খেয়ালই করা হতো না। তাই শিক্ষানবিশ আলোকচিত্রীদের এই প্রদর্শনীতে শেখা ও চেষ্টার ছাপ স্পষ্ট। ৫৯ জনের চোখে পাটুরিয়া ফেরিঘাটের গল্পগুলো উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। কিছু গল্প ছবিতে ধরা পড়েছে, আর কিছু রয়ে গেছে ফ্রেমের বাইরে।
