নওগাঁয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চলমান দুর্গাপূজার একটি মণ্ডপের গণেশ প্রতিমা কুড়াল দিয়ে ভাঙলেন গোলাম রাব্বানি নামের এক যুবক। এ ঘটনায় ওই যুবককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে সেখানে কর্তব্যরত আনসার সদস্যসহ স্থানীয়রা।
আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে সদর উপজেলার হাসাইগাড়ি ইউনিয়নের হাতাশ খাড়াপাড়া সার্বজনীন পূজা মণ্ডপের ওই গণেশ প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এই ঘটনায় ওই এলাকার স্থানীয় সনাতন ধর্মবলম্বীদের মাঝে ক্ষোভ ও উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। তাদের আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হয়েছে।
তবে পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবককে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় সনাতনীদের পূজা উৎসব পালনের জন্য সার্বিকভাবে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
আটক গোলাম রাব্বানি একই ইউনিয়নের মধ্য হাতাশ পাড়ার মোহাম্মদ মুসার ছেলে।
পূজা উদযাপনের নেতা, মন্ডপ কমিটি ও আনসার সদস্যের সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে গোলাম রাব্বানি নামের ওই যুবক একটি কুড়াল দিয়ে মণ্ডপে ঢুকে গণেশ প্রতিমাকে কোপ দিয়ে ভাঙচুর করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দৌড়ে গিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি এই ঘটনা ঘটান। পরবর্তীতে আনসার সদস্যসহ স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে বিষয়টি পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
এদিকে কেউ বলছেন, আটক গোলাম রাব্বানি কিছুটা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। কেউ বলছেন, তিনি মানসিক ভারসাম্যের বেশ ধরেছে। আবার কেউ বলছেন, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও এটি একটি ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিমা সংক্রান্ত বিষয়, কাজেই বিষয়টি স্পর্শকাতর। এবং ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজব ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে। কাজেই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। তবে বর্তমানে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মন্ডপের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য মোসা. ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমরা দুই নারীসহ চারজন দায়িত্বে আছি। এদিন সকালে আমরা দুই নারী সদস্য পাশে খেতে গিয়েছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করে গোলাম রাব্বানি নামের ওই ছেলে হাতে কুড়াল নিয়ে ২-৩ আঘাত করে গণেশের ওই প্রতিমা ভেঙে দেয়। পরে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে কুড়ালসহ আটক করে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই এই ঘটনা ঘটায় ওই যুবক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গতকাল ডিউটিতে আসার পর থেকেই দেখছি স্থানীয় ওই ছেলে কয়েকবার এই মন্ডপে এসে ঘুরঘুর করছিল। প্রায় সবসময় এখানে আসা যাওয়া করছিল। সে পাগল না, তবে পাগলের বেশ ধরছে।’
হাতাশ খাড়াপাড়া পূজা মন্ডপের সাংগঠনিক সম্পাদক নিখিল প্রামানিক বলেন, ‘আজ সপ্তমীর দিন। এদিন হঠাৎ করে ছেলেটা এসে কুড়াল দিয়ে গণেশ প্রতিমা ভেঙে দিল। এতে বাড়িতে আসা আত্মীয়স্বজনসহ স্থানীয় হিন্দুরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। এখন আমাদের পূজার সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে প্রশাসন, পুলিশ ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তারা আমাদের পাশে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা একজন কারিগর নিয়ে এসে গণেশ প্রতিমা ঠিক করে পূজার কার্যক্রম চালাতে বলেছে। এতে করে তারা সার্বিক সহযোগিতা করবে এবং বিকেলে এমপি মহোদয় আসতে চেয়েছেন। তারপরও আমরা চাই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এবং তার সাথে আরও কেউ ছিল কিনা বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা হোক।’
জানতে চাইলে সদর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মাধব চন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে এবং তার কি উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। কারণ হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। এখনও ৫ দিন চলবে এই উৎসব। কাজেই সনাতনীরা যেন তাদের পূজা সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে উদযাপন করতে পারে সেই জন্য আইন শৃঙ্খলাবাহিনীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করছি।’
জানতে চাইলে জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক প্রদীপ কুমার কুন্ডু বলেন, ‘ঘটনা শুনেছি। পূজা চলাকালীন প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আমি ইউএনও’র সাথে কথা বলেছি। এখন এসিল্যান্ডের সাথে ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠ বিচার চাই, যেন আর কেউ প্রতিমা ভাঙার সাহস না পায়।’
জানতে চাইলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনা জানার পর উর্ধ্বতন স্যারসহ পুলিশ সদস্যরা সেখানে গিয়েছে। ওই ছেলে পুলিশের হেফাজতে আছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
