নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে বাগেরহাটের মোংলায় জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় মোংলার নারিকেলতলা মন্দির মাঠে চলমান ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ (Renewables Now) প্রচারাভিযানের আওতায় এ জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়।
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ যৌথভাবে এ জনসমাবেশের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল। আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- মোংলা উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীসহ আরও অনেকে।
জনসমাবেশে বক্তারা দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ প্রমাণ করে, সরকার পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে আন্তরিক। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভবন, স্কুল-কলেজসহ সব সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। এর ব্যবহার সম্প্রসারিত হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে।
শরীফ জামিল বলেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছি, জেল-জুলুমের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু কখনো আপস করিনি। আজ প্রথমবারের মতো সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় নীতি ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে, জনস্বার্থ বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা থেকে আমরা বিরত থাকব। সুন্দরবন ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় আমাদের অবস্থান আগের মতোই অটল। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ প্রচারাভিযানের মূল কথা হলো—যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্ভব, সেখানেই অবিলম্বে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ একটি জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে তা অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য সেই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা তৈরি করে। তাই যত দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ঘটবে, তত দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
আব্দুল মান্নান হাওলাদার বলেন, সুন্দরবনের ওপর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু বাংলাদেশ বা স্থানীয় অঞ্চলের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এর প্রভাব সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, বঙ্গোপসাগর, জেলে, মৌয়াল-বাওয়ালি এবং স্থানীয় কৃষি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর পড়তে পারে। সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের অমূল্য আধার, তাই এর সুরক্ষায় কয়লাভিত্তিক জ্বালানির ব্যবহার কমানো জরুরি। পরিবেশ রক্ষা, গ্রামবাংলার মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক উদ্যোগগুলোকে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’—এই বার্তা প্রতিটি গ্রাম ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
বদরুল আলম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাংলাদেশে অনেক আগে শুরু হলেও প্রয়োজনের তুলনায় এর সম্প্রসারণ হয়নি। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু সংকট আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের অস্তিত্ব ও প্রাণপ্রকৃতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই সংকটের জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও এর ভয়াবহ প্রভাব আমাদেরই বহন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে মোংলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে আমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দাবি করি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই, বাংলাদেশ পরিবেশদূষণ নয়, বরং প্রকৃতি ও পৃথিবীকে রক্ষার পথেই এগিয়ে যেতে চায়। আমাদের লক্ষ্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা, কারণ আমাদের আর কোনো বিকল্প পৃথিবী নেই।”
মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, সুন্দরবনসহ পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, দূষণ ও দখলের কারণে জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত এবং ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। রামপালে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ উদ্যোগ সফল করতে সবার অংশগ্রহণ জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি জেলে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ প্রচারাভিযানের মাধ্যমে দেশজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ, জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থায় ন্যায্য রূপান্তরের দাবি তুলে ধরা হচ্ছে। এ প্রচারাভিযানের মূল বার্তা— ‘প্রাকৃতিক সম্পদে জ্বালানির যোগান, স্বনির্ভরতার পথে বাংলাদেশ’।
