সংবিধান সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক
সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই সনদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থবিল, আস্থা-অনাস্থা প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিশেষ ৪টি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই সনদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থবিল, আস্থা-অনাস্থা প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিশেষ ৪টি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সংসদ ভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, আইন বিষয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদসহ প্রায় অর্ধশত সংবিধান বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। বৈঠকে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্গঠন, উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানান, এ পর্যন্ত যতগুলো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে আজকের আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল রিভিউ, প্রশাসনিক আদেশের ওপর বিচারিক এখতিয়ার এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর বিশ্লেষণধর্মী মতামত দিয়েছেন। সভায় মূলত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া, রূপরেখা এবং এর কর্মপরিধি কেমন হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব পাওয়া গেছে। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তার সুনির্দিষ্ট কাঠামো কী হবে এবং সেই উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো সুরাহা করা যায় কি না, তা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়েছে। অনেকেই প্রস্তাব করেছেন যে উচ্চকক্ষ কার্যকর থাকলে সেখানে শাসক ও বিরোধী দলের সমঝোতার ভিত্তিতে স্পিকার বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা সাজানো যেতে পারে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা তাদের লিখিত মতামত জমা দেওয়ার পর কমিটি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং জুলাই সনদের রূপরেখা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গ টেনে সালাউদ্দিন আহমদ জানান, ৭০ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বে নির্ধারিত চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র- অর্থ বিল, আস্থা বা অনাস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি পরিস্থিতি-এই বিষয়গুলো বাদে সংসদ সদস্যরা দলের বাইরে স্বাধীনভাবে মতামত ও ভোট দিতে পারবেন। আজকের বৈঠকে এ বিষয়ে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক মত দিয়েছেন এবং এর বাইরে বড় কোনো ভিন্নতা দেখা যায়নি। এছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগের আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের মধ্য থেকে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের পর সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য রয়েছে। এ ছাড়া সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিধান বা শক্তিশালী কোনো কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাবও এসেছে।
সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, বর্তমান সংসদ সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংবিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণ করেছেন এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি হিসেবে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। গণভোট বা অন্যান্য রাজনৈতিক দাবিগুলোর বিষয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রেরিত তালিকাভুক্ত অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকগণ অংশগ্রহণ করেন। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক মতামত এবং প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
