ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তুরস্কের গালাতাসারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তবে হিজাব পরা ছবি দেওয়ায় তার দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তিনবার আবেদন করেও ভিসা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে মাথা খোলা ছবি জমা দিতে বলার লিখিত নথি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থী বলেন, ফ্রান্সের ভিসার জন্য তিনবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন তিনি। প্রতিবারই তার হিজাব পরা ছবি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
ওই শিক্ষার্থীর দাবি, একই সময়ে হিজাব পরা ছবি জমা দিয়েও তার পরিচিত কয়েকজন ফরাসি ভিসা পেয়েছেন। ফলে তার ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার কয়েকজন বন্ধু একই সময়ে ভিসা পেয়েছে। তারা হিজাব পরা ছবি জমা দিয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছে, হিজাব পরার কারণে আমার ছবি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে স্পষ্ট অসংগতি রয়েছে।’
সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি ইরাসমাস কর্মসূচির আওতায় আর্থিক সহায়তাও পেয়েছিলেন ওই শিক্ষার্থী। ফ্রান্সের অনুমোদিত ভিসা আবেদন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে তিনি তিনবার আবেদন করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবার তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় ফ্রান্সে অবস্থানের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহের কথা জানায়। তবে ইরাসমাস কর্মসূচির আওতায় তার আবাসন ও শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
দ্বিতীয়বার এক বন্ধুর সঙ্গে আবেদন করেন ওই শিক্ষার্থী। তার বন্ধুর আবেদন অনুমোদিত হলেও আবারও প্রত্যাখ্যাত হয় তার আবেদন।
এরপর হিজাবের কারণেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে বলে সন্দেহ হয় তার। সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ লিখিতভাবে জানার জন্য তৃতীয়বার আবেদন করেন তিনি। ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি তাদের নিজেদের ভাষায়, যাচাই করা যায় এমন লিখিত নথিতে প্রত্যাখ্যানের কারণ দেখতে চেয়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইমেইল ও অন্যান্য উপায়ে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ চালিয়ে গেছি। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে স্বাক্ষর করা একটি নথি দিতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে মাথা খোলা ছবি চাওয়া হয়েছে।’
শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ফরাসি কনস্যুলেট জেনারেলের কাছে পাঠানো তার আবেদনপত্রের সঙ্গে ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি নথি ফেরত দেওয়া হয়। ‘আত্তেসতাসিওঁ দ্য রেতুর দ্য দসিয়ে’ শিরোনামের ওই নথিতে ছবিতে মাথা খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ফরাসি ভাষায় ‘তেত ন্যু’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ মাথা অনাবৃত রাখা।
সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান ওই শিক্ষার্থী। সুযোগটি হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, ‘আমার জীবনবৃত্তান্তে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম যুক্ত হবে, এ নিয়ে আমি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম। ভেবেছিলাম, এটি আমার সামনে আরও অনেক সুযোগের দরজা খুলে দেবে। নিজের যোগ্যতায় অর্জন করা একটি সুযোগ এভাবে হারানো খুবই কষ্টের। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছি।’
হিজাব খুলে ছবি দেওয়ার কথা সরাসরি বলায় তাকে ধর্মীয় অনুশীলন ও শিক্ষার সুযোগের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার পক্ষে হিজাব খোলা সম্ভব নয়, কিন্তু সামনের ব্যক্তি আমার কাছে সেটিই প্রত্যাশা করছেন। আমাকে দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনের ব্যক্তি নিজেকে এমন কিছু বলার অধিকারী মনে করছেন, এ বিষয়েও আমার ক্ষোভ হয়।’
নিজের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের উদ্দেশ্য সহানুভূতি পাওয়া নয় বলে জানান ওই শিক্ষার্থী। বরং ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীরা যাতে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আগে থেকেই বিষয়টি জানতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, সে জন্যই তিনি ঘটনাটি প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এখানে আমার একটি অর্জন রয়েছে। এ অর্জন নিয়ে আমি লজ্জিত হব না। হিজাব পরি বলে নিজের সাফল্যও লুকিয়ে রাখব না।’
গালাতাসারাই বিশ্ববিদ্যালয়সহ ফরাসি ভাষায় পাঠদান করা তুরস্কের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক হিজাব পরা শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাঠদান ফরাসি ভাষায় হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে যেতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি সরবোনে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করে থাকি, তাহলে আমাকে অন্য কোনো দেশে যেতে হবে কেন?’
তিনবার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নতুন করে আর ভিসার আবেদন করার পরিকল্পনা নেই ওই শিক্ষার্থীর। তবে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীরা যেন একই পরিস্থিতির শিকার না হন, সে জন্য বিষয়টির সমাধান চান তিনি।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘যদি কোনো নিয়ম থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষের উচিত সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা। প্রত্যেকের জানা উচিত, তাদের কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।’
ভিসা আবেদনকেন্দ্রের কর্মীদেরও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘কোনো একজন কর্মীর খামখেয়ালি আচরণের কারণে আমাদের যেন এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।’