কালবেলা · দেশ
নারী কৃষকের অধিকার নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি
১১/১০/২০২৬

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ভূমি ও কৃষিতে নারী কৃষকের অধিকার এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয় নিয়ে জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) আয়োজনে এ সেমিনারে কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি, জমির মালিকানা, কৃষিঋণ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধায় প্রবেশাধিকার এবং সমমজুরি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তাদের মতে, এসব অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এএলআরডির চেয়ারপারসন ও নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবিরের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য আন্না মিনজ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি। আলোচনায় অংশ নেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের (রিইবি) পরিচালক সুরাইয়া বেগম, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বিভাগীয় প্রধান ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রেজিয়া খাতুন ও এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
মূল প্রবন্ধে রওশন জাহান মনি দাবি করেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সেই খাদ্য সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ পাঁচটি সহযোগী সংস্থার যৌথভাবে প্রণীত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই।
খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। খাদ্য কার কাছে, কী দামে এবং কীভাবে পৌঁছাচ্ছে, তার বণ্টন ও প্রাপ্যতার ওপরও তা নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী। অথচ কার্যকর ভূমি মালিকানায় নারীর অংশ মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। উত্তরাধিকারে বঞ্চনা, জমির মালিকানা না থাকা এবং কৃষক হিসেবে স্বীকৃতির অভাবে তারা কৃষিঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, প্রশিক্ষণ, কৃষি কার্ড, ভর্তুকি ও সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিএআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কৃষকের সংজ্ঞায় প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করাও প্রয়োজনীয়।’
বিএলআরআইয়ের বিভাগীয় প্রধান ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রেজিয়া খাতুন বলেন, ‘দেশের জাতীয় উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৯ শতাংশ। এ খাতের ব্যবস্থাপনায় নারীরা ৯০ শতাংশ অবদান রাখছেন। অথচ তাদের বড় একটি অংশের শ্রম এখনো মজুরিবিহীন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে নারীবান্ধব প্রযুক্তি ও কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কমিউনিটিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।’
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২.৫ শতাংশ। এ হার কমাতে বন্ধ থাকা খাসজমি বিতরণ প্রক্রিয়া অবিলম্বে চালু করতে হবে। নারীদের খাসজমি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সরকারি নীতিমালা পরিবর্তন প্রয়োজন।’
পাশাপাশি কৃষকের কাছে উন্নতমানের বীজ ও নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া এবং প্রযুক্তির ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষিশ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকুচিত না করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আন্না মিনজ বলেন, ‘শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সমানাধিকার ও কৃষিতে স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে তাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।’
ভূমি ও কৃষিতে নারীর প্রবেশাধিকার এবং সমমজুরি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকারের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, ‘নারীরা শুধু ঘরের ভেতরেই কাজ করেন না, বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ থেকে শুরু করে সরাসরি কৃষিকাজ ও ফসল বিপণনেও যুক্ত রয়েছেন। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। দেশের কৃষিতে প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী যুক্ত থাকলেও তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
মূল প্রতিবেদনে যান ↗