দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার তিন জেলায় তার সফর ঘিরে নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। চট্টগ্রামে ১ হাজার ৯৪৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। রাজশাহীতে ধর্মসভা পরিদর্শন ও জনসভায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে, রংপুরে তার আগমন উপলক্ষে এক বছর ধরে ঝুলে থাকা সড়কের সংস্কারকাজ চার দিনে অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিন জেলাতেই প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও প্রস্তুতি ও আয়োজনের ধরনে রয়েছে ভিন্নতা।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার মহানবমীর দিন আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নগরীর রহমতগঞ্জের জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। স্বাধীনতার পর দেশের কোনো সরকারপ্রধানের চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। এর আগে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জেএম সেন হলে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। তাকে বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ। সংগঠনটির সাধারণ
সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ বলেন, প্রধানমন্ত্রী পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি আলোচনাসভায় অংশ নেবেন। তার আগমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য আনন্দের বিষয়। তাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও সম্মান জানানোর প্রস্তুতি চলছে।
মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন দুর্গোৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। তার উপস্থিতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের বার্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তারা আশা করছেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথ জানান, এবার চট্টগ্রাম নগরীর ২৯৪টি এবং জেলার ১ হাজার ৬৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে মণ্ডপের সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৯। এ ছাড়া ৬০০ ঘটপূজার আয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরীতে সর্বাত্মক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, পূজামণ্ডপগুলোয় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেএম সেন হল পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়ার কথা রয়েছে। রাতে রেডিসন ব্লু হোটেলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায়ও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ মঙ্গলবার রাজশাহীতে এসে দুপুর দেড়টার দিকে ঐতিহাসিক রাজশাহী ধর্মসভায় শারদীয় দুর্গাপূজা পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পরে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন। তার সফর ঘিরে প্রশাসন ও বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কর্মসূচিস্থলে প্রধানমন্ত্রীর নামে কোনো ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে না।
রাজশাহী ধর্মসভার সভাপতি বিশ্বনাথ সরকার জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেখানে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন ও রক্তচন্দন গাছের চারা রোপণ করার কথা রয়েছে তার। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের প্রতি সম্মান জানিয়ে কোনো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত ব্যানার রাখা হয়নি। সফর ও জনসভা সফল করতে দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরীতে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কর্মসূচিস্থলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবির জানান, গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি পুলিশের বিশেষায়িত সিআরটি সদস্যরা মহড়া দিচ্ছেন।
জনসভায় রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার আখচাষির মধ্যে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সফর ঘিরে কৃষিপ্রধান রাজশাহীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক হিমাগার নির্মাণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পদ্মার তীরে আধুনিক রিভার সিটি গড়ে তোলার দাবিও সামনে এসেছে।
রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি শিল্পায়ন ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে রংপুর নগরীতে এক বছর ধরে ঝুলে থাকা একটি সড়কের সংস্কারকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ১৮০ মিটার সড়কটির কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ভাঙাচোরা রাস্তা ও ধুলাবালিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলেন হাজারো মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর আগমনের খবরের পর দিনরাত কাজ করে চার দিনে সড়কটির সংস্কারকাজ অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সড়ক ও পাশের আরসিসি ড্রেন সংস্কারে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ ১২ হাজার ১২৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছরের ১৩ অক্টোবর কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কার্যাদেশ অনুযায়ী ৪৫৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তবে সড়কের পুরনো কার্পেটিং তুলে ফেলার পর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে।
সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, সড়কটিতে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। ঠিকাদারের পক্ষে কাজ তদারকিতে থাকা এক ব্যক্তি জানান, চার-পাঁচ দিন ধরে জোরেশোরে কাজ চলছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে রাতে সার্চলাইট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শ্রমিকের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে হঠাৎ কাজের গতি বাড়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ব্যবসায়ী শিমুল মিয়া বলেন, এক বছর ধরে যে কাজ ঝুলে ছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যে করা সম্ভব হলে আগে কেন করা হয়নি, সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। রিকশাচালক নাজমুল বলেন, ভাঙা রাস্তায় যানজট ও দুর্ভোগ ছিল নিয়মিত ঘটনা। এখন রাস্তা ঠিক হচ্ছে, এতে তারা খুশি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সফরসূচি অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে রংপুর নগরীর রাধা গোবিন্দ মন্দির বা ধর্মসভা পরিদর্শনের উদ্দেশে রওনা দেবেন। বেলা ১১টার দিকে মন্দির পরিদর্শন শেষে তার সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফেরার কথা রয়েছে।
তিন জেলার সফরে ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা গুরুত্ব পাচ্ছে।
