সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ও নতুন করে হামলার হুমকিতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো প্রবাসীর জীবিকা, দেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে কার্যক্রম বন্ধ ও সীমিত হওয়ায় ঢাকা থেকে দেশটিতে যাওয়া-আসার ৫১টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন ৫ হাজার ৪১৮ জন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা প্রবাসী কর্মীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের গুরুত্ব অপরিসীম। একাধিক জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে আসা মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে সৌদি আরবের অবদান ছিল ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশটি শুধু বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে সৌদি আরবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অভিঘাত কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন ছাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
তাই সৌদি আরবে অবস্থানরত এবং সেখানে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মস্থলের পরিস্থিতি এবং জরুরি সহায়তার প্রয়োজন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আতঙ্ক বা গুজবের পরিবর্তে প্রবাসীরা যেন দ্রুত সরকারি সহায়তা ও সঠিক তথ্য পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সেই সঙ্গে, ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিতের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে সরকারকে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে ছুটি শেষে সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা কর্মীদের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাদের অনেকেরই নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিলম্বের কারণে চাকরি হারানো, বেতন বন্ধ হওয়া কিংবা নিয়োগকর্তার অসহযোগিতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সৌদি কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব কর্মীর কাজে যোগদানের সময়সীমা বাড়ানো এবং তাদের চাকরি সুরক্ষায় সহযোগিতা চাওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ, টিকিটের অর্থ ফেরত, বিকল্প রুটে যাত্রা এবং জরুরি যোগাযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা মনে করি, এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান হতে হবে দায়িত্বশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে কোনো পক্ষের প্রতি অযাচিত অবস্থান না নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নিজস্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখার পক্ষে কাজ করা। সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিক, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির কারণে নতুন কর্মী পাঠানো সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেÑ তার প্রভাব মূল্যায়ন করে বিকল্প শ্রমবাজারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে হবে।
এই সংকটকে শুধু তাৎক্ষণিক দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে চলবে না। বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একক কোনো শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজার অনুসন্ধান, দক্ষ কর্মী তৈরি, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।