প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজশাহীতে আসছেন। তার সফরের প্রথম পর্বে ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে ঐতিহাসিক রাজশাহী ধর্মসভায় শারদীয় দুর্গাপূজা পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। পরে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রশাসন ও বিএনপির পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি। তবে এবারের সফরে নগরজুড়ে চোখে পড়ছে ব্যতিক্রমী দৃশ্য- প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে নেই কোনো ব্যানার কিংবা ফেস্টুন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। জনসভা সফল করতে সোমবার বিকালেই মাঠ প্রস্তুতিসহ সার্বিক আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত কর্মসূচি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে তিনস্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রাজশাহী ধর্মসভার সভাপতি বিশ্বনাথ সরকার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ধর্মসভায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার এ সফর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
এই কোনো রাষ্ট্রপ্রধান রাজশাহীতে দূর্গাপূজা পরিদর্শন করতে আসছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখানে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন ও রক্তচন্দন গাছের চারা রোপণ করবেন। এটি হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়।
ধর্মসভা পরিদর্শন শেষে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জনসভাকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রস্তুতি ও তৎপরতা রয়েছে। তবে অন্যান্য সময়ের রাজনৈতিক সফরের সঙ্গে এবারের দৃশ্যপটে রয়েছে ভিন্নতা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন স্থানে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে স্বাগত জানিয়ে কোনো ব্যানার কিংবা ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে না। এমন কী মাদ্রাসা মাঠের আনাচে-কানাচে নেই কোনো ব্যানার বা ফেস্টুন।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ও জনসভা ঘিরে দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সফরের কর্মসূচি সফল করতে নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী কোনো ধরনের বিলাসিতা ও প্রদর্শনী পছন্দ করেন না। তার পছন্দের প্রতি সম্মান দেখাতেই এবারের অনুষ্ঠানে কোনো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত ব্যানার নেই।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রাজশাহী নগরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কর্মসূচিস্থল ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসভায় মানুষের যাতায়াত ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার ফয়েজুল কবির এবং জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয়ের প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রতিটি কর্মসূচি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সোমবার বেলা ১২ টার দিকে মাদ্রাসা মাঠের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন আরএমপি কমিশনার ফয়েজুল কবির।
এ সময় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান ঘিরে গোটা নগরীতে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে। সিআরটি সদস্যরাও মহড়া দিচ্ছে।
জনসভায় রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার আখচাষির মধ্যে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর। এতে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং কৃষি উৎপাদন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে শুধু আনুষ্ঠানিকতা কিংবা জনসভা নয়, রাজশাহীর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশাও সামনে এসেছে। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব সম্ভাবনা ও সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে বিএনপি নেতাদের। পাশাপাশি পদ্মার তীরে আধুনিক রিভার সিটি গড়ে তোলা, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগার স্থাপন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দাবি জানাতে চান তারা।
রাজশাহী সদরের সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, রাজশাহী দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল। আম, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন এবং কৃষিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো না গেলে কৃষির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। এ কারণে আধুনিক হিমাগার, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার দাবি দীর্ঘদিনের। পদ্মার তীরকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও বিনোদন অবকাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। পরিকল্পিত রিভার সিটি বাস্তবায়ন করা গেলে নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পর্যটকদের আকৃষ্ট করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে, শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও রাজশাহীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি রয়েছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা পেতে পারেন। তবে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরেও রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশা অনেক- কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগিয়ে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীকে উন্নয়নের নতুন ধারায় এগিয়ে নেয়া। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজশাহীর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশা পূরণে কতটা ভূমিকা রাখে- তা দেখার অপেক্ষায় নগরবাসী।
