সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজায় টাঙ্গাইলের হাজারের বেশি মন্ডপে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। রঙ-তুলির শেষ আঁচড়ে দেবী দুর্গার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ ফুটিয়ে তুলতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন তারা।
এবার জেলাজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক ১ হাজার ৩৫৭টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অমল ব্যানার্জি।
পূজা উদযাপন ফ্রন্টের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭০টি মন্ডপ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মির্জাপুর এবং সর্বনিম্ন ৩৪টি মন্ডপ রয়েছে ভূঞাপুরে।
অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইল সদরে ২৩৩টি, কালিহাতীতে ১৮২, নাগরপুরে ১৩৮, দেলদুয়ারে ১২৮, ঘাটাইলে ৯৪, বাসাইলে ৮১, মধুপুরে ৬০, গোপালপুরে ৫৭, সখীপুরে ৪৪ এবং ধনবাড়ীতে ৩৬টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সনাতন ধর্মমতে, ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর ঘট স্থাপনের মধ্যদিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দুর্গাদেবী ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে কৈলাশে ফিরে যাবেন।
চলছে রঙ-তুলির শেষ আঁচড়
সরেজমিনে টাঙ্গাইল শহরের শ্রী শ্রী কালিবাড়ি, আদালত পাড়া, থানাপাড়া, সাবালিয়া, রেজিস্ট্রিপাড়া, কলেজপাড়া ও প্যারাডাইস পাড়ায় পূজা মন্দির পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে।
কারিগররা এর মধ্যেই বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর খড় ও মাটির প্রলেপ দিয়ে দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন। এখন শিল্পীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেবীর চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক ও বিভিন্ন অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলতে দিনরাত অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিমা তৈরির কারিগর নিশি কান্ত পাল বলেন, ছোট-বড় প্রতিমা তৈরিতে কাজ ভেদে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন তিনি। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন প্রতিমা তৈরিতে লাভ অনেকটা কমে গেছে।
এ বছর পাঁচটি প্রতিমার কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, টাঙ্গাইল শহরের বড় কালীবাড়ি ও রেজিস্ট্রি পাড়া, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী ও ফরিদপুরে আলফাডাঙ্গায় প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন।
এদিকে জেলার মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজা মন্ডপটি উপজেলার সর্ববৃহৎ মন্ডপ হিসেবে খ্যাত। প্রতিবছরই দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীদের আগমনে এ মন্ডপে মুখরিত হয়ে উঠে।
এ বছর সেখানে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন, মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নৌহাটা গ্রামের চন্দ্র পালের ছেলে অচিন্ত পাল।
মৃৎশিল্পী অচিন্ত পাল জানান, পাশপাপাশি তিনি মির্জাপুর সাহাপাড়া ও মধ্যপাড়া সার্বজনীন মন্ডপেও প্রতিমা তৈরি করছেন। এতে তিনি এক লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেবেন। এছাড়া তিনি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের লোকনাথ মন্দির, ঝিনাইদহ শহরে ৩টি, মাগুরা ও ফরিদপুর শহরে ২টি মন্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন।
নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এদিকে দুর্গোৎসবকে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ করতে জেলাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অমল ব্যানার্জি বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশের সাথে পূজা উদযাপন কমিটির একাধিক মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিটি পূজা মন্ডপে পুলিশ প্রশাসন, আনসার সদস্যের পাশাপাশি তাদের পূজা কমিটির নিজস্ব সেচ্ছাসেবক কর্মীরাও দায়িত্ব পালন করবে। প্রতি বছরের মতো এবারও সকলের অংশগ্রহণে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিটি মন্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকবে বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার।
তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে জেলায় গোয়েন্দা তৎপরতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মন্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে এবার একটি উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন পুলিশ সুপার।
