জাতীয় সংসদ ভবনের শব্দযন্ত্র পরিচালনা ও মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ, স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় শতকোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানের অগ্রগতির কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান দুদকের মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান।
এছাড়া, গত ৪১ কর্মদিবসে সংস্থাটির বিভিন্ন অভিযোগে মামলা, অভিযোগপত্র, এনফোর্সমেন্ট, সম্পত্তি ক্রোক ও বিভিন্নজনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খুলনা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. রশীদুজ্জামান মোড়লের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দাপটে স্বাস্থ্য খাতে মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগেও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, গত ৪১ কর্মদিবসে ১২১টি মামলা ও ৬১টি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদন, ৬১টি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা, ৬৮টি নথিতে সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার অনুমোদন এবং দুর্নীতির অভিযোগসংশ্লিষ্ট ২২ জনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সংসদের শব্দযন্ত্র মেরামতে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: জাতীয় সংসদ ভবনের প্লেনারি হলে স্থাপিত শব্দযন্ত্র পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান করছে দুদক। এ ঘটনায় কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ১৩ই জানুয়ারি এ অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় সংস্থাটির সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে। অভিযোগের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে দরপত্র, ব্যয়ের হিসাব, বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তথ্য চাওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে নথি না পাওয়ায় গত ৭ই এপ্রিল আবারও তাগিদ দেওয়া হয়।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এসআইএস) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেটি সচল করতে উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের পক্ষ থেকে শব্দযন্ত্রটি পরীক্ষা করে মেরামতের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব বলে জানানো হয়। এ জন্য প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রকৌশলীদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী বাবত আরও ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ঘটনায় গত ১৬ই এপ্রিল জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। সেদিন তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, বিদ্যুতের তারের সংযোগ ঢিলা হয়ে যাওয়ায় সংসদের শব্দযন্ত্রে বিভ্রাট দেখা দিয়েছিল। সংস্কারকাজের প্রথম ধাপে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের কারিগরি অভিজ্ঞতার ঘাটতিকেও তিনি দায়ী করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও একাধিকবার শব্দযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। গত ১২ই মার্চ অধিবেশনের প্রথমদিন শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটে কিছু সময়ের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। পরে ৫ই এপ্রিল আবারও সমস্যা দেখা দিলে সংসদ অধিবেশন ৪০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়। শব্দযন্ত্রের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রকৃত ব্যয়, দরপত্র প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে দুদক। তবে এ অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ: স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগেও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি করা সরঞ্জামের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
সাবেক এমপি মোড়লের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন: জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রশীদুজ্জামান মোড়লের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে কত টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে, তা ব্রিফিংয়ে জানানো হয়নি। রশীদুজ্জামান মোড়ল ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে খুলনা-৬ আসন (কয়রা ও পাইকগাছা) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৬ই অক্টোবর পটুয়াখালীর মহিপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। সে সময় র্যাব জানিয়েছিল, সহিংসতা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। এবার তার বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করার অনুমোদন দিলো দুদক।
