সৌদি আরবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের আগে থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ঘটনাটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার সহায়তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম নাজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সিটি আখতার। সিটি আখতার সুইটি আখতার নামেও পরিচিত। সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দেশটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ইসলামী আইনের তাআজির বিধান অনুযায়ী তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
তবে এ ঘটনায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে আগে থেকে অবহিত না করার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে তাঁর আইনি অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও যথাযথ যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
প্রাপ্ত বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১৬ জন, ২০২৪ সালে একজন এবং ২০২৬ সালের অক্টোবরে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য রয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়; সব বছরের তথ্য একত্র করে নির্ভুল মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি যৌথ মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। ওই সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বিদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের বিচারপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। তাঁদের অনেকের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা কঠিন হতে পারে। আরবি ভাষায় পরিচালিত আদালতের কার্যক্রম বুঝতে সমস্যা এবং পর্যাপ্ত কনস্যুলার সহায়তা না পাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০১১ সালের অক্টোবরে। ওই সময় একজন মিশরীয় নিরাপত্তারক্ষীকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত আট বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে সে সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংস্থার বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩৮ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক এবং একজন ছিলেন বাংলাদেশি। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। ফলে দেশটিতে তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি অধিকার এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় কনস্যুলেটকে আগে থেকে অবহিত না করার তথ্য এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত, অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা এবং কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে আরও তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
-20261021134840.jpg&w=1440&q=75)